History of Bogra

বগুড়ার ইতিহাস

প্রাগৈতিহাসিক ও ঐতিহাসিক যুগে বঙ্গদেশের বগুড়া জেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।প্রাচীনআমলে এজেলা পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে পরিচিত ছিল (আর.সি.মজুমদার১৯৪৩: পৃ.২০) ।এ জেলার প্রাচীন নাম পুণ্ডবর্ধনকে প্রাচীন সাহিত্যকর্ম ও লেখমালায় কখনও পুণ্ড্র, কখনও পৌণ্ড্র, আবার কখনও পুণ্ডবর্ধন নামে উল্লেখকরা হয় ( সুপ্তিকণা মজুমদার ২০১০: পৃ.৭)।পুণ্ড্রবর্ধন নামকরণ হয়েছে পুণ্ড্রর জনগোস্ঠীর নামানুসারে। এ জেলার মহাস্থান গড়ই ছিল পুণ্ড্র বা পৌণ্ড্র দেশের রাজধানীপুণ্ড্রবর্ধন নগর।(প্রভাস চন্দ্র সেন২০০০: পৃ.৩২  )।পুণ্ড্রনগর ছিল একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র।উত্তরবঙ্গের বগুড়া,  রাজশাহী ও দিনাজপুর পুণ্ড্ররজনপদের আওতাভূক্ত ছিল (আর.সি.মজুমদার১৯৪৩: পৃ.২০) । ঐতরেয়  ব্রাহ্মণে প্রথম বারের মত উপজাতি গোষ্ঠীরুপেপুণ্ড্রেরনাম উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াওবোধায়নধর্মসূত্র,সাংখ্যায়ন শ্রৌতসূত্র, মহাভারত,হরিবংশ, জৈন্য কল্পসূত্র ও রামায়নসহ বিভিন্ন পূরাণে পুণ্ড্রবর্ধনের নাম পাওয়া যায়।  মহাভারতে বাসুদেব নামকপুণ্ড্ররাজার নামপাওয়া যায়। যিনি পুণ্ড্রবর্ধনে রাজত্ব করেন।যাহোক এ জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব হলো মহাস্থানে সুরক্ষিত নগরীর ধ্বংসাবশেষের জন্য (জে.এন.গুপ্ত১৯১০: পৃ.১৭)।

পুণ্ড্রবর্ধনের রাজনৈতিক ইতিহাস বৈদিক সাহিত্য, বুড্ডিস্ট ও জৈন্য রচনাদিতে পাওয়া যায় না। মহাস্থান গড়ে প্রাপ্ত পুরাকালের ব্রাহ্ম লিপিই একমাত্র বগুড়া জেলারপ্রামাণিক ইতিহাস(শাহ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান২০০০: পৃ.৪৮)। এ লিপিতে প্রমাণিত হয় যে এ জেলা মৌর্য শাসনাধীন ছিল(পাল.জি.তিন্তি১৯৯৬:পৃ.৩৩-৩৮)। লিপিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত জনগণকে রাজকোষ হতে গন্ডক ও কাকনিয় মুদ্রায় অর্থ সাহায্য করার আদেশ প্রদানের কথা জানা যায় এবং আবার সুদিন এলে ধানও মুদ্রা উভয়ই রাজভান্ডারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খ্রি: পূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে সমগ্র উত্তর বাংলা পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্ভূক্ত ছিল।বৌদ্ধ গ্রন্থ অশোকাবদানেউল্লেখ আছে যে, সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি গভীর অনুরক্তের জন্য বহু জৈন্য সন্ন্যাসীকে হত্যা করেন। মৌর্য সম্রাটদের পতনের পর প্রায় দু’শ বছর পুণ্ড্রবর্ধনেররাজনৌতিক ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় ন (এ.কে.এম. শামসুল আলম ২০০৯ :পৃ.৩৫৩) মৌর্যদের পরে শুঙ্গ বংশের শাসনের সূচনা হয়। মহাস্থানে শুঙ্গযুগের প্রচুর পরিমানে পোড়ামাটির মূর্তি ও চিত্র ফলক পাওয়া গেছে।এতে বুঝা যায় মৌর্য বংশের পতনের পরেও পুণ্ড্রবর্ধনের সমৃদ্ধি অব্যাহত ছি(আর.সি.মজুমদার১৯৪৩:পৃ.৪৪)।পুণ্ড্রবর্ধনে কুষাণ শাসনও পরিষ্কার নয়। যদিও কুষাণদের মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে এখানে।

গুপ্ত আমলের ৯টি আবিষ্কৃত তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, ৫ম শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বঙ্গদেশের পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তি গুপ্ত সাম্রাজ্যের আন্তভূর্ক্ত ছিল। এভূক্তিতে গুপ্ত সম্রাট কর্তৃকচিরাতদত্ত, জয়দত্ত এবং ব্রহ্মদত্ত নামক শাসক নিয়োগের কথা জানা যায়। ৯টি তাম্রশাসনের মধ্যে ১৯১৫ খ্রি: দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি থানার দামোদরপুর গ্রামে ৫টিতাম্রশাসন পাওয়া গেছে। এ পাঁচটি  তাম্রশাসন বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটিতে সংরক্ষিত আছে। এর একটি হতে জানা যায় যে, ৪৪৩ খ্রি:(১২৪ গুপ্তাব্দে) কুমার গুপ্তেররাজত্বকালে পুণ্ড্রবর্ধন ভূক্তিতে চিরাতদত্ত নামক উপরিক শাসনকর্তা নিযুক্ত ছিল(রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়  ২০০৮:পৃ.৩৮) । কুমারগুপ্তের তাম্রশাসনটি পুণ্ড্রবর্ধন (মহাস্থান)হতে জারি হয়েছিল।কুমার গুপ্তের অপর একটি তাম্রশাসনে পুণ্ড্রবর্ধন ভূক্তির উল্লেখ পাওয়া যায় এবং কুমারমাত্য বেত্রবর্ম্মা তৎকালীন উপরিক চিরাতদত্ত কতৃর্ককোটিবর্ষের শাসনকর্ত নিযুক্ত হন(প্রাগুক্ত, পৃ.৩৯) । বুধগুপ্তের দুইখানি তাম্রলিপির প্রথমটি হতে জানা যায় যে,উপরিক মহারাজ ব্রহ্মদত্ত পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির শাসনকর্তছিলেন। এসময়ে নাভক নামক এক ব্যাক্তি পলাশবৃন্দক গ্রাম হতে ভূমি বিক্রয়ের আদেশ প্রাপ্ত হন (প্রাগুক্ত, পৃ.৪৬)। বুধগুপ্তের দ্বিতীয় তাম্রলিপি পুণ্ড্রবর্ধন ভূক্তির শাসনকর্তার নাম ছিল জয়দত্ত। তার অধীনে আয়ুত্তক  সান্তক বা গান্ডক কোটিবর্ষের শাসনকর্তা ছিল(প্রাগুক্ত, পৃ.৪৬) । বুধগুপ্তের উপরোক্ত দুটি তাম্রলিপি সম্ভবত: ৪৮১-৮২ খ্রি: (১৬৩ গুপ্তাব্ধ) বলে অনুমান করা হয়। এসব তাম্রলিপির আলোকে প্রমানিত হয় যে, পুণ্ড্রবর্ধন ভূক্তি গুপ্ত সম্রাটদের ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত শাসনাধীনছিল(শাহসুফিমোস্তাফিজুররহমান,২০০০, পৃ.৪৮) । তাম্র শাসনগুলো হতে সুবিন্যস্ত স্থানীয় প্রশাসনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রস্হল ছিলপৌণ্ড্রনগর। বর্তমানে যা মহাস্হান নামে পরিচিত (দিলিপ.কে.চক্রবর্তী ২০০১: পৃ.৫৬) ।

দামোদরপুরে আবিষ্কারে পঞ্চম তাম্রলিপি হতে জানা যায় ৫৩৩-৩৪ খ্রি: (২১৪ গুপ্তাব্ধ) গুপ্ত সম্রাট ভানু গুপ্ত এর পুত্র দেবভট্রারককে পুণ্ড্রবর্ধন ভূক্তির উপরিক মহারাজ(শাসনকর্তা) নিযুক্ত করেন (রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ২০০৮:পৃ.৪৭) । ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষাংশ থেকে সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত মখৌরী ও পরবতী  গুপ্তবংশীয়রাজাদের মধ্যে প্রায় অর্ধ শতাব্দীব্যাপী পুরুষানুক্রমিক বিবাদ চলে(আর.সি.মজুমদার১৯৪৩:পৃ.৫১) । এর ফলে ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে গুপ্তরাজারা দুর্বল হয়ে পড়ে।গুপ্ত বংশের শেষ রাজা মহাসেনগুপ্ত উত্তর বাংলায় তার অধিকার বজায় রেখেছিলেন যা ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। মুর্শিদাবাদ জেলাররাজবাড়িডাঙ্গাকে কেন্দ্র করে ৭ম শতাব্দীতে আবির্ভূত হয় গৌড় রাজ্য। এ রাজ্যের দুজন রাজার নাম হলো জয়নাগ ও শশাঙ্ক (মো: মোশারফ হোসেন  ২০০৭: পৃ.৬০) ।ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় এ অঞ্চল গৌড় নামে সুপরিচিত ছিল। যাহোক গুপ্ত বংশের দুর্বলতার সুযোগে শশাঙ্ক নামক এক রাজা উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গের একবিশাল এলাকা জুড়ে এক সার্বভৌম ও স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

সম্ভবত: ষষ্ঠ শতাব্দীতে বগুড়া জেলা গৌড়শ্বরের শাসনাধীনে ছিল। এর পর হতে এ জেলার ইতিহাস সন্বন্ধে কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না ( মোহাম্মদ আলী ওএস.বি.ভট্র্যাচার্য১৯৮৬:পৃ.৪) । সপ্তম শতাব্দীর গোড়ার দিকে শশাঙ্ক গৌড় রাজ্যের সার্বভৌম ক্ষমতা দখল করেন। বগুড়াজেলাসহ পুণ্ড্রবর্ধন তার রাজ্যাধীন ছিল।পশ্চিমও পূর্ব বাংলার অংশ বিশেষে গৌড় রাজ্যের উদ্ভব হয়।  বাংলার ইতিহাসে তিনিই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নরপতি ছিলেন। শশাঙ্ক সম্ভবত: ৬০৬ খ্রি: পর্যন্ত রাজত্ব করেন।শশাঙ্কের মৃত্যুর পর এ জেলা ছিল ভারতবর্ষের শেষ হিন্দু নৃপতি হর্ষবর্ধনের (৬০৬-৬৪৭ খ্রি:)শাসনাধীন। বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ সম্ভবত: ৬৩৮ খ্রি:বাংলাদেশ ভ্রমন করেন। তার ভ্রমন কাহিনীতে উল্লেখ আছে যে, বাংলার এ অঞ্চল হর্ষবর্ধনের শাসনাধীনে ছিল(জে.এন.গুপ্ত১৯১০:পৃ.২০) । আর্যমঞ্জুশ্রীমুলকল্প নামকগ্রন্হে হর্ষবর্ধনের বহু সৈন্যসহ শশাঙ্কের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলা আছে।

রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর কিছুদিন পর হিউয়েন সাঙ পুণ্ড্রবর্ধনে (৬৩৮ খ্রি:) আসেন। তার  ভ্রমনের সময় হতে বগুড়া জেলার ধারাবাহিক ও প্রামাণিক ইতিহাসের সন্ধানপাওয়া যায়। তার সি-ইউ-কি নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্হে বঙ্গদেশের বহু মূল্যবান তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। হিউয়েন সাঙ পুণ্ড্রবর্ধনে ২০টি বৌদ্ধ বিহার ও শতাধিক দেব মন্দিরদেখেছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মহাস্হানগড় বা পুণ্ড্রনগর ছিল পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী(সৈয়দ মাহমুদুল হাসান১৯৭১:পৃ.২৭) । এ নগরীর নদীর তীরেবহুসংখ্যক মালবাহী বড়নৌকা ও বড় বড় নৌকা নোঙর করা অবস্থায় দেখা যেত।তিনি পুণ্ড্রবর্ধন নগরীর অদূরে অবস্থিত বহু ভিক্ষুপূর্ণ সমৃদ্ধ পো-শি-পো তথা ভাসুবিহারেগমন করেছিলেন। সেখানে তিনি সঙ্ঘারামের ৭০০ সন্ন্যাসী দেখেছিলেন( সুধীর রন্জন দাশ ১৯৯২: পৃ.১৭১)। সপ্তম শতাব্দীতে হিউয়েন সাঙ এ অঞ্চলে এক  স্থায়ীসরকারের কার্যক্রম লক্ষ্য করেন। এতদ অঞ্চলের জনগণ বিদ্যানুরাগী ছিল। এসময় পুণ্ড্রনগরের আয়তন ছিল ৩০ লি (প্রায় ১০ কিলোমিটার)। হিউয়েন সাঙ এর বিবরণহতে জানা যায় খ্রি: ৭ম শতকে পুণ্ড্রনগর একটি সমৃদ্ধশালী নদী বন্দর ছিল। করতোয়াকে কেন্দ্র করেই পুণ্ড্রনগরের উদ্ভব ও শত শত বছর ধরে এর বিকাশ ঘটেছিল(এ.কে.এম. শামসুল আলম ২০০৯: পৃ.৩৫০) ।এসব বিবরনের উপর ভিত্তি করে আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭১-৭২ খ্রি: প্রথমবার ও ১৮৭৯-৮০ খ্রি: দ্বিতীয়বারবাংলাদেশ  ভ্রমন করেন। তিনিই সর্বপ্রথম কৃতিত্বের সাথে মহাস্হানগড়ের ধ্বংসাবশেষকে পুণ্ড্রনগর হিসেবে চিন্হিত করতে সক্ষম হন( স্যার আলেকজান্ডারকানিংহাম১৯৬৯: পৃ.১০২-১৪) ।৭২৫ খ্রি: উড়িষ্যার জনৈক শৈলরাজা কতৃর্ক পুণ্ড্রবর্ধন বিজিত হয়। কিন্তু অল্পকাল পরেই কনৌজের যশোবর্ম্মা(৭২৫-৭৫২ খ্রি;) উত্তরভারত বর্ষে স্বীয় রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপনের নিমিত্তে সমরাভিযান শুরু করেন এবং গৌড়াধিপতিকে হত্যা করে বঙ্গদেশ জয় করেন। এই বিজয়াভিযান বাকপতিবিরচিত গৌড়বহো গ্রন্থের বিষয়বস্তু। কিন্তু যশোবর্মার গৌড়বঙ্গে অধিকার খুব বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। কলহন রচিত রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, কাশ্মীররাজললিতাদিত্য (৭২৪-৭৫০ খ্রি:) ৭৩৬ খ্রি: যশোবর্মাকে পরাজিত করেন এবং বঙ্গদেশ দখল করেন। এর ফলে খুব সম্ভবত কাশ্মিররাজ বগুড়াজেলাসহ সমগ্র বঙ্গদেশেরঅধীশ্বর হন। রাজতরঙ্গিনীতে ললিতাদিত্যের পৌত্র জয়পীড়ের সম্পর্কে একটি গল্পে পৌণ্ড্রবর্ধনের উল্লেখ পাওয়া যায়। ড. নাজিমুদ্দিনের মহাস্থান,ময়নামতি ও পাহাড়পুরনামক  গ্রন্থে কাহিনীটি উল্লেখ করে বগুড়া জেলা গেজেটীয়ারে (১৯৮৯) বলা হয়েছে যে,

কলহনের বিবরন অনুযায়ী জয়পীড় এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তার পিতামহের অনুকরণে দিগ্বিবিজয়ে বের হন। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে তার ভগ্নিপতি যজ্ঞ কাশ্মিরঅধিকার করেন। জয়পীড়ের সেনাবাহিনী এ সময় তাকে পরিত্যাগ করে। অতপর: সমুদয় অনুচরকে বিদায় দিয়ে তিনি একাকী ছদ্নবেশে ভ্রমন করতে করতে রাজাজয়ন্তের রাজধানী পুণ্ড্রবর্ধন নগরে প্রবেশ করেন। সে সময়  জয়ন্ত পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্যের একজন সামন্ত রাজা ছিলেন। এ নগরে অবস্থানকালে, তিনি কিছুদিন যাবতত্রাসসৃষ্টিকারী একটি বাঘকে হত্যা করে রাজা জয়ন্তের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি  জয়ন্তের কন্যা কল্যাণী দেবীকে বিয়ে করেন। তৎকালীন গৌড়ে পাঁচজন স্বাধীন নৃপতিরাজত্ব করতেন। তিনি তাদেরকে এবং অন্যান্য নৃপতিদেরকে যুদ্ধে পরাজিত করে তার শ্বশুরের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেন। কলহন আরও উল্লেখ করেছেন যে,কুমার জয়পীড় দুর্গের বাহিরে কার্তিক মন্দিরে কমলা নামে পরিচিত রাজ-দরবারের জনৈক সুন্দুরী নর্তকীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তার প্রেমে পড়েন এবং তাকে বিয়েকরেন।

বঙ্গদেশ সম্পর্কে কলহন এবং তিব্বতীয় ঐতিহাসিক লামা তারানাথের বিবরনে জানা যায় ছয় জন ক্ষুদ্র নৃপতি তখন পুণ্ড্রবর্ধন শাসন করতেন। এতে বঙ্গদেশের কেন্দ্রীয়শাসনের অভাবে খন্ড বিখন্ড শাসনের চিত্র ফুটে ওঠে। জয়পীড়ের কাহিনী থেকে প্রতীয়মান হয় যে, খ্রি: অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত মহাস্থান বা পুণ্ড্রনগর পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানীছিল(জে.এন.গুপ্ত১৯১০:পৃ.২১) ।

শশাঙ্ক পরবর্তী প্রায় শতবর্ষব্যাপী অভ্যন্তরীণ গোলোযোগ ও বহি:শত্রুর পুন:পুন আক্রমনের ফলে বঙ্গদেশের রাজতন্ত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল এবং অরাজকতা বিরাজমানছিল । এসময় বাংলায় কোন স্থায়ী সরকার ছিল না বললেই চলে। যা পালদের খালিমপুর তাম্রশাসনে ‘মাৎস্যন্যায়ম’ বলে আখ্যায়িত হয়েছে। এরুপ অবস্থায় অষ্টমশতাব্দীর মধ্যভাগে পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল মাৎস্যন্যায়মের অবসান ঘটিয়ে উত্তর পশ্চিম বাংলায় পাল রাজ্য স্থাপন করেন (আব্দুলমমিনচৌধূরী২০০৮:পৃ.৮) ।গোপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রায় চার শত বৎসর বাংলা শাসন করেন। গোপালের বংশ পরিচয় বা পাল বংশের উৎপত্তি সম্বন্ধেতেমন কিছু জানা যায়না। একমাত্র খালিমপুর তাম্রশাসনে গোপালের পিতা বপ্যট এবং পিতামহ দয়িতবিষ্ণুর নাম উল্লেখ আছে।

পাল রাজাদের পিতৃভূমি ছিল বরেন্দ্র ভূমি বা উত্তর বাংলা। পাল রাজাদের ও বরেন্দ্রীর রাজনৈতিক ইতিহাস সম্বন্ধে তথ্য জানার প্রধানতম উৎস্য হলো সন্ধ্যাকর নন্দীররামচরিতম কাব্য। মহিপাল প্রথমের তাম্রশাসন, রামচরিতম কাব্য ও তিব্বতীয় ঐতিহাসিক লামা তারানাথের তথ্যমতে গোপাল পুণ্ড্রবর্ধনে জন্ম গ্রহণ করেন(আব্দুলমমিনচৌধূরী২০০৮:পৃ.১৬-১৭) । অতএব এটি বলা যায় যে, পাল রাজারা ছিল অত্র অঞ্চলের আদি বাসিন্দা(শাহসুফিমোস্তাফিজুররহমান২০০০:পৃ.৪০)।রামচরিতমে বলা হয়েছে যে, বরেন্দ্র ছিল গঙ্গা ও করতোয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চল। এই করতোয়া সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে বরেন্দ্রীকে পূর্ব দিকে দিয়ে প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনেরপূর্ব সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হত।

গোপাল সম্পর্কে পাল রাজাদের বিভিন্ন তাম্রলিপিতে বিশদ কিছু জানা যায় না। গোপাল কত বৎসর রাজত্ব করেন তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় না। পাল বংশেরবিভিন্ন তাম্রশাসনে প্রায় শতবর্ষব্যাপী যে অরাজকতা দেখা দেয় গোপালতার অবসান ঘঠিয়ে শান্তি  এবং পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশংসা করা হয়েছে।আনুমানিকভাবে গোপালের রাজত্বকাল ছিল ২০ বা ২৫ বৎসর(আব্দুলমমিনচৌধূরী২০০৮:পৃ.২০)। তিনি আনুমানিক ৭৫৬ থেকে ৭৮১ খ্রি: পর্যন্ত রাজত্ব করেন(প্রাগুক্ত,পৃ. পরিষিষ্ঠ ১) ।পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপল পুণ্ড্রবর্ধনে জন্ম গ্রহন করেন। পুণ্ড্রবর্ধনেই গোপালের রাজ্যাভিষেক হয় এবং এ স্থানেই পরবর্তী পাল রাজাদের রাজধানীছিল। গোপালের মৃত্যুর পর ধর্মপাল (৭৮১-৮২১ খ্রি:) সিংহাসনে আরোহন করেন। গোপাল কতৃর্ক প্রতিষ্ঠিত পাল রাজারা বগুড়া জেলাসহ প্রায় সমগ্র উত্তর বাংলা দ্বাদশশতাব্দী পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে শাসন করেন।

 ধর্মপাল(৭৮১-৮২১ খ্রি:) একজন দিগ্বিজয়ী নরপতি ছিলেন এবং পাল সাম্রাজ্যের উথ্বান ও প্রতিপত্তি প্রসারে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।তিনি পুণ্ড্রবর্ধন ভূক্তিসহ সমগ্রউত্তরবঙ্গ আপন রাজ্যাধীন করেন। তার রাজত্বকাল ছিল বাংলার গৌরবময় যুগ। ধর্মপাল পিতার ন্যায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন।তিনি বৌদ্ধ ধর্মের অনন্য পৃষ্ঠপোষকছিলেন। বরেন্দ্রের প্রাচীন নগরী সোমপুর নামক স্থানে তিনি এক প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ বিহার স্থাপন করেন যা বর্তমানে নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে আবিষ্কৃত হয়েছে। পাহাড়পুরবিহার ছিল ভারতবর্ষের বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার। ধর্মপাল পালরাজাদের মধ্যে প্রথম গৌরবময়সূচক ‘পরমেশ্বর’ ‘পরমভট্রারক’ ‘মহারাজাধিরাজ’ সর্বোচ্চ সার্বভৌম উপাধিধারন করেন(আব্দুলমমিনচৌধূরী২০০৮:পৃ.৩১) ।

 ধর্মপালের মত্যুর পর তার পুত্র দেবপাল (৮২১-৮৬১ খ্রি:) পাল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহন করেন। উত্তরাধিকারী সূত্রে দেবপাল পিতা ধর্মপালের বিশাল সাম্রাজ্যলাভ করেন। তিনি পিতৃরাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে সমর্থ হন। তার শাসনামলে বগুড়া জেলা পাল বংশের অধীন ছিল। দেবপাল একজন শক্তিশালী নরপতি ছিলেন। তারসামরিক সাফল্যের ফলে পাল সাম্রাজ্যের সীমানা বিন্ধ্যপর্বত ও পশ্চিমে কম্বোজ( কাশ্মির সীমানা) পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। পাল বংশের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার যুগ ছিলধর্মপাল ও দেবপালের তেজোদ্দীপ্ত শাসনকাল।

 দেবপালের মৃত্যুর পর পতন -অভ্যুদয়ের বন্ধুর পথ ধরে পাল সাম্রাজ্যের গৌরব ম্লান হতে শুরু করে(রমেশ চন্দ্র মজুমদার ১৯৮১: পৃ.৫৮) । তারপর পাঁচজনউত্তরাধিকারীর মধ্যে নারায়ণ পাল ব্যাতীত বিগ্রহ পাল বা শুরপাল, রাজ্যপাল, দ্বিতীয় গোপাল ও দ্বিতীয় বিগ্রহ পাল দুর্বল নৃপতি ছিলেন। দুর্বল নৃপতি, বহি:শত্রুরআক্রমণ ও অভ্যন্তনীণ গোলযাগের সুযোগে পাল সাম্রাজ্যের উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় কম্বোজ পাল শাসনের অভ্যুথ্বান ঘটে। কম্বোজ বংশের সঠিক পরিচয় জানা যায়না। দশম শতাব্দীর প্রথম দিকে তাদের উথ্বান শুরু হয় এবং শতাব্দীর মাঝামাঝিকালে তাদের শাসন সুপ্রতিস্ঠিত হয়। এ সময় সমগ্র উত্তরবঙ্গ গৌড় রাজ্য নামেপরিচিত ছিল। এজন্য হয়ত কম্বোজ রাজ গৌড়াধিপতি উপাধি গ্রহন করেন (সৈয়দ মোশারফ হোসেন১৯৬৫: পৃ.১৯) ।প্রথম মহিপাল (৯৯৫-১০৪৩ খ্রি:) অতি অল্পসময়ের মধ্যেই পাল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে সফল হন এবং স্বীয় বাহুবলে পাল সাম্রাজ্যকে আসন্ন বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করেন(আর.সি.মজুমদার১৯৪৩:পৃ.৩৯)। বগুড়াজেলার মহিপুর মহিপালের স্মৃতি বহন করছে (ড. মুহম্মদ আব্দুর রহিম ও অন্যান্য ২০০৬: পৃ.৯৩)।

প্রথম মহীপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্য অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও বহিরাক্রমণের ফলে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে ও বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়। একমাত্র রামপালইকিছুটা শৌর্য-বীর্যের পরিচয় দেয়। প্রথম মহীপালের মৃত্যুর পর তার পুত্র নয়পাল (১০৪৩-১০৫৮খ্রি:) সিংহাসনে আরোহন করেন। তার মৃত্যুর পর তৃতীয় বিগ্রহ পালের(১০৫৮-১০৭৫ খ্রি:) রাজত্বকালে বগুড়া জেলা তার রাজ্যের অন্তভূর্ক্ত ছিল। তৃতীয় বিগ্রহপালের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় মহীপাল পাল সিংহাসনে আরোহন করেন।রামচরিতমের বর্ননানুসারে তিনি একজন স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন। তার সময়ে দিব্য ও ভীমের নেতৃত্বে প্রজা বিদ্রোহ সংঘঠিত হয়( আব্দুল মোমিন চৌধুরী ১৯৬৬: পৃ.১৫৬-৫৭)। এই বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে দ্বিতীয় মহীপাল নিহিত হন। বিদ্রোহ ও বিদ্রোহোত্তর ঘটনাবলীর বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত ‘রামচরিতম’নামক সংস্কৃত গ্রন্থে। এভাবে বরেন্দ্রে কৈবর্ত বংশের উথ্বান ঘটে। দিব্য বরেন্দ্রের রাজা হন। তার মৃত্যুর পর তার ভাই রুদোক বরেন্দ্রের সিংহাসনে আরোহন করেন।রদোকের মৃত্যুর পর তার পুত্র ভীম সিংহাসনে আরোহন করেন। ভীম অত্যন্ত শক্তিশালী রাজা ছিলেন। কিন্তু পালরাজ রামপাল ভীমকে পরাজিত করেন। পালদেরবরেন্দ্রভূমি পুনরুদ্ধার হয়। রামপাল  পুণ্ড্রনগর থেকে রামাবতীতে ( গৌড়) রাজধানী স্থানান্তর করেন।

পরবর্তী পাল রাজারা কুমার পাল (১১২৪-১১২৯ খ্রি:) তৃতীয় গোপাল (১১২৯- ১১৪৩ খ্রি:) ও মদন পাল (১১৪৩-১১৬১ খ্রি:)  দুর্বল শাসক ছিলেন। তাদের রাজত্বকালেবগুড়া জেলা পাল রাজাদের শাসনাধীন ছিল। তবে সে সময়ে পুণ্ড্রবর্ধনে পাল রাজাদের প্রভাব হ্রাস পায়। মদন পাল ১৮ বৎসর রাজত্ব করেন। তিনিই পাল বংশের শেষপাল রাজা ছিলেন (বি.এন.মুখার্জী ১৯৯৬: পৃ.১৭০)।

 সেন রাজগণের আদি পুরুষ দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক দেশের অধিবাসী ছিলেন। সেনরাজাগণের শিলালিপি অনুসারে তারা চন্দ্রবংশীয় ও ব্রহ্মক্ষত্রীয় ছিলেন ( আর.সি.মজুমদার, পৃ.২০৬-২০৭)। সেন বংশ কখন, কি উপায়ে ও কি কারনে বাংলায় আগমন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। সামন্তসেন কর্ণাটক থেকে বৃদ্ধ বয়সে আসেন ও রাঢ়ে বসতি স্থাপন করেন। তার পুত্র হেমন্ত সেন রাঢ় অঞ্চলে  পাল সাম্রাজ্যের সামন্ত রাজা ছিলেন। হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয়সেন (১০৯৭-১১৬০ খ্রি:) সেন রাজ বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।  তিনি পাল বংশের শেষ রাজা মদন পালকে পরাজিত করে বগুড়া জেলাসহ উত্তর বাংলারঅধিকাংশ ভূভাগ দখল করেন( আর.সি. মজুমদার ১৯৪৩: পৃ.২১২-২১৩)। তিনি পরমেশ্বর,পরমভট্রারক ও মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেন। একজন সামান্যসামন্তরাজ পদ হতে বিজয় সেন স্বীয় মেধা, সাহস ও রণকৌশল দ্বারা পাল শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্ববংশীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন(ড. এস.এম. রফিকুল ইসলাম২০০১: পৃ.২১) । বিজয় সেনের মৃত্যুর পর তার পুত্র বল্লাল সেন(১১৬০-১১৭৮ খ্রি:) সিংহাসনে বসেন। তিনি সম্ভবত: ১৮ বৎসর রাজত্ব করেন। পিতার মতই তিনিঅরিরাজ-বৃষভশঙ্কর ও অন্যান্য সম্রাট সুলভ উপাধী গ্রহণ করেন। বল্লাল সেনের পর তার পুত্র লক্ষণ সেন (১১৭৮-১২০৬ খ্রি: ) পিতৃ সিংহাসনে বসেন। বগুড়া জেলাসহসমগ্র পুণ্ড্রবর্ধন তার রাজ্যভূর্ক্ত ছিল। লক্ষণ সেনের শেষ জীবনে রাষ্ট্র্যভ্যন্তরে গোলেযোগ ও বহিরাক্রমণের ফলে উদ্ভূত সংকটকালে বখতিয়ার নামক এক মুসলিমসৈনিক ১২০২ বা ১২০৪ খ্রি: সেন রাজ্যের রাজধানী লক্ষণাবতী দখল করেন।

বগুড়া জেলার অন্তগর্ত ভবানীপুরের কয়েক মাইল উত্তরে এবং শেরপুরের কিছু দক্ষিণে কমলাপুর নামক স্থানে পরবর্তী সেন রাজাদের রাজধানী ছিল। বলা হয়ে থাকেবল্লাল সেন এটি নির্মাণ করেন। সেন বংশের শেষ রাজা অচ্যুত সেন গৌড়ের শাসক বাহাদুর শাহ (১৩১০-১৩৩০ খ্রি:) কতৃর্ক সিংহাসনচ্যুত হন (জে.এন গুপ্ত, ১৯১০,পৃ.২২)।

প্রাচীন পান্ডুলিপি ও লেখমালায় থেকে বঙ্গদেশের প্রাচীন শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। সে সময় এদেশে শাসন ব্যবস্থা ছিল রাজতান্ত্রিক। রাজার পদ ছিলবংশানুক্রমিক। রাজা উত্তরাধিকারী নির্বাচন করতেন। রাজা ঐশ্বরিক সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন এবং পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবেপরমেশ্বর,পরমভট্রারক ও মহারাজাধিরাজ প্রভৃতি উপাধী গ্রহণ করতেন। ( জে.এন,গুপ্ত ১৯১০: পৃ.২১) পরমভট্রারক উপাধী রাজার দৈবক্ষমতার পরিচায়ক।(সুনীতিভূষণ কানুনগো ১৯৯০: পৃ.৪৫) রাজাকে দর্শন করা একটি পূণ্যের কাজ বলে মনে করা হত।

 গুপ্ত রাজারা শাসনকার্যের সুবিধার জন্য দেশকে কয়েকটি প্রশাসিনক এলাকায় বিভক্ত করেন। প্রধান সরকারী কার্যালয় (সচিবালয়) মহাকরণ বা অধিকরণ নামেপরিচিত ছিল। পুণ্ড্রনগরে রাজধানী ও মহাকরণ একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্য ভূক্তিতে পরিণত হলে এই  কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাদেশিক সদরদফতরে পরিণত হয়। সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক এলাকার নাম ছিল ভূক্তি। ভূক্তির প্রশাসককে ভূক্ত্যপরিক বলা হতো। প্রাচীনকালে বাংলাদেশের সরকারী নাম ছিলপুণ্ড্রবর্ধনভূক্তি(সুনীতি ভূষণ কানুনগো ১৯৯০: ভূমিকা)।সেন আমল পর্যন্ত না হলেও মৌর্য যুগ হতে পাল আমলের শেষ অবধি পুণ্ড্রবর্ধন বিভাগের প্রশাসনিক সদরদফতর হিসেবে পুণ্ড্রবর্ধনের অবস্থান অব্যাহত ছিল( বাংলাপিডিয়া ২০১১: পৃ.৩৭৫)। ভূক্তির অর্থ প্রদেশ। পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তি গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনাধীন ছিল। এটির প্রধানশাসন কেন্দ্র ছিল পুণ্ড্রনগর। যেটি বর্তমানে এ জেলার মহাস্থানে অবস্থিত। বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহীসহ সমগ্র উত্তর বাংলা পূণ্ড্রবর্ধনভূক্তির অন্তভূর্ক্ত ছিল। ( আব্দুলমোমিন চৌধুরী,পৃ.১৮৪) গুপ্ত সম্রাট নিজে উপরিক-মহারাজা নামক রাজকর্মচারীকে পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তিতে নিয়োগ করেন। পুণ্ড্রবর্ধন নগরীর একটি নগর পরিষদ বা পৌরসভাছিল। মনে হয় শাসনকার্য পরিচালনার জন্য স্থানীয় ব্যাক্তিদের অংশগ্রহণ ছিল। ( প্রফেসর শাহানারা হোসেন ২০১২: পৃ.৬২)এছাড়াওপুণ্ড্রনগরছিলমহামাত্রনামকরাজকর্মচারীরশাসনকেন্দ্র।

পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তি কয়েকটি বিষয়ে বিভক্ত ছিল।এর একটিহলোকোটিবর্ষবিষয়।  প্রত্যেক ভূক্তি পর্যায়ক্রমে কতগুলো বিষয়, মন্ডল, বীথী ও গ্রাম ইত্যাদীতে বিভক্ত ছিল। এসমস্ত প্রতিটি ভাগের একটি করে অধিকরণ বা সরকারী কার্যালয় ছিল। প্রশাসনিক ইউনিট বিষয়কে বর্তমানকালের জেলার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। বিষয়পতিরপ্রধানকে কুমারমাত্য বা আয়ুত্তক বা বিষয়পতি বলা হতো। বিষয়পতির অধীকরণে (কার্যালয়) আরও চারজন সদস্য হলেন নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম সার্থবাহ, প্রথম কুলিক ওপ্রথম কায়স্থ। প্রত্যেক বিষয় কয়েকটি মন্ডলে বিভক্ত ছিল। মন্ডলের প্রশাসককে মান্ডলিক বলা হত। বিভিন্ন তাম্রশাসনে পুণ্ড্রবর্ধন ভূক্তির অন্তগর্ত শ্রীঙ্গবের ,দক্ষিণাংশক ও দক্ষিণ বীথির উল্লেখ আছে। প্রত্যেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রশাসনিক এলাকায় উপরিক মহারাজা শাসনকর্তা নিয়োগ করেতন। প্রত্যেকটি বীথি আবার কতগুলোগ্রামে বিভক্ত ছিল। এসব ছাড়াও আরও কতগুলো প্রশাসনিক বিভাগের নাম পাওয়া যায়। যথা-খন্ডল,ভাগ,আবৃত্তি,চতুরক ও পাঠক ইত্যাদি। ভূক্তি থেকে শুরু করে গ্রামপর্যন্ত শাসন কর্তারা সরকার থেকে বেতন পেতেন (সুনীতু ভূষণ কানুনগো ১৯৯০: পৃ.৭৮)।

  গুপ্তযুগে বঙ্গদেশে প্রভাবাধীন অঞ্চলে সামন্তরা রাজকীয় শাসনকার্য পরিচালনা করত। তারা সামন্ত, মহাসামন্ত উপাধিধারী ছিলেন। গুপ্তযুগের ন্যায় পাল যুগেও বিভিন্নতাম্রশাসনে সুর্নির্দিষ্ট বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগের নাম পাওয়া যায়। যথা: ভূক্তি,বিষয়মন্ডল, ও বীথি। এসময় বঙ্গদেশে পুণ্ড্রবর্ধন,বর্ধমান ও দন্ডভূক্তি নামে তিনটিভূক্তির উল্লেখ রয়েছে রাজকীয় অনুসাশনে। পালবংশীয় রাজন্যবর্গ পরমসৌগত, পরমেশ্বর,পরমভট্রারক, মহারাজাধিরাজ প্রভৃতি গৌরবময় উপাধীতে ভূষিত ছিলেন।কেন্দ্রীয় প্রশাসন গুপ্তযুগের অনুরুপ ছিল। প্রশাসন পরিচালনার জন্য রাজা প্রধান মন্ত্রী ও মন্ত্র্রী পরিষদের সাহায্য গ্রহন করতেন। রাজকীয় অনুশাসনে কেন্দ্রীয় প্রশাসনেরবিভিন্ন বিভাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা: মহাধর্মাধ্যক্ষ(প্রধান ধর্মীয় নীতি নির্ধারক), সান্ধিবিগ্রহিক(পররাষ্ট্র নীতি),দন্ডনায়ক(বিচার) চৌরোদ্ধরণিক(অপরাধ দমন)মহাপ্রতীহার(প্রতিরক্ষা)মহাবলাধিকরণিক(সামরিক) কর্তাকৃতিক(পূর্ত) প্রভৃতি। পাল রাজাদের শাসন পদ্ধতি সেন রাজারা গ্রহন করেন। সেন রাজারা পালদের মতগৌরবময় উপাধি ছাড়াও অশ্বপতি,গজপতি প্রভৃতি নতুন উপাধি গ্রহণ করত। কেন্দ্রীয় প্রশাসন পালদেরমত ছিল তবে কিছু কিছু নতুন পদ ও বিভাগের সৃষ্টি হয়।বাংলাদেশের পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে ধীরে ধীরে একটি বিধিবদ্ধ শাসন প্রণালী গড়ে উঠেছিল এবং পাল ও সেনআমলে তা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৮ মাইল উত্তরে মহাস্থান অবস্থিত যা প্রাচীনকালে বিভিন্ন শিলালিপি ও তাম্রলিপি এবং প্রাচীন গ্রন্থাদিতে পুণ্ড্রনগর বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে পরিচিতছিল। বর্তমানে এখানে একটি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। সম্ভবত: একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মহাস্থানে পরশুরাম নামক ভৌজগৌড় বংশীয়নামক একজন ক্ষত্রীয় নৃপতির রাজধানী ছিল। প্রবাদ আছে যে, সে সময় এক মুসলমান ফকির শাহ সুলতান মাহী সাওয়ার কতৃর্ক মহাস্থান বিজিত হয়। শাহ সুলতানবলখী বখলের(প্রাচীন ব্যাকট্রিয়া) জনৈক আসগর নামক রাজার পুত্র। পরবর্তীতে তিনি দরবেশী জীবন গ্রহন  করেন।তার অনুগামী সুফী দরবেশ ও আরও কয়েকজনমুরিদসহ মৎস্য আকৃতির নৌকায় করে মহাস্থানে আসেন। এজন্য তাকে মাহীসাওয়ার বা মৎস্যারোহী  বলা হয়(আব্দুল করিম ১৯৫৯:পৃ.৮৮) এখানকার স্থানীয় বেশকিছু হিন্দু তার নিকট ইসলাম গ্রহন করেন।পরবর্তীতে শাহ সুলতা বলখী ও রাজা পরশুরামের মধ্যে এক যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। এতে রাজা পরাজিত ও নিহত হন সৈয়দমাহমুদুল হাসান, ১৯৭১:পৃ.২৭-২৮)। বলা হয়ে থাকে যে, হরপাল নামক জনৈক ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতা শাহ সুলতান বলখীর বিজয়কে সহজ করে দেয়। দরবেশকতৃর্ক মহাস্থান বিজয় কাহিনী ঘটে ১০৪৩ খ্রি: যাহা উল্লেখ করেছেন বগুড়ার ইতিহাস রচয়িতা শ্রী প্রভাস চন্দ্র সেন। কিন্তু গবেষকদের মতে বখতিয়ারের জয়ের ১৬১বৎসর পূর্বে সংঘঠিত এ বিজয় কাহিনী কোন  ঐতিহাসিকের গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায় না।

ত্রো্য়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজির বাংলার পশ্চিম ও উত্তর অংশ জয়ের ফলে বগুড়া জেলা তার শাসনাধীনে আসে। এর ফলে বাংলায়মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়।তিনি সুশাসনের লক্ষ্যে নব প্রতিষ্ঠিত রাজ্যকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে সেনাপতিদের হাতে শাসনভার অর্পণ করেন। ‘বরসৌল’ এরশাসনভার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আলি মর্দান খলজি।বরসৌলকে বর্তমান দিনাজপুর জিলার অন্তর্গত ঘোড়াঘাট এলাকায় নির্দেশ করা হয়। এ স্থানটি বগুড়া,রংপুর ওদিনাজপুর এই তিনটি জেলার  মিলনস্থলে অবস্থিত(আবদুল করিম ১৯৯৯:পৃ.১১৩)। বখতিয়ার খলজি লখনৌতিতে রাজধানী স্থাপন করেন। লখনৌতির পূর্ব নাম হললক্ষণাবতী বা গৌড়। লখনৌতিতে মুসলমান সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা ও সুফীদের আস্তানা তৈরীতে পৃস্ঠপোষকতা দান করেন। ১২০৪ হতে১২২৭ খ্রি: পর্যন্ত বখতিয়ার খলজির পর তিনজন শাসক অত্র অঞ্চল শাসন করেন।

১২২৭ থেকে ১২৮৭ সাল খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত লখনৌত দিল্লীর অধীনে ছিল। মোট ১৬জন শাসনকর্তা এসময় শাসন করেন। দিল্লীর কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতার সুযোগেপ্রাদেশিক শাসনকর্তাদের অনেকেই নিজেদেরকে স্বাধীন শাসক বলে ঘোষনা করেন( আবদুলকরিম১৯৫৯:পৃ.২৪) ।এদের মধ্যে মুগীস উদ্দিন তুঘরল শ্রেষ্ঠ শাসনকর্তাছিলেন ( আবদুল করিম১৯৯৯:পৃ.১৩৮)। সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবন দিল্লী সালতানাতের অশান্তি,বিশৃংখলা ও অরাজকতা দূর করে একটি শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থাপ্রবর্তন করেন। ১২৮০ সালেলখনৌতির শাসনকর্তা মুগিসউদ্দিন তুঘরলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তাকে দমন করে দ্বিতীয় পুত্র বুগরা খানকে লখনৌতিরশাসনকর্তা(১২৮১খ্রি:) নিযুক্ত করেন। ১২৮১ সালে বলবনের মৃত্যুর পর বুগরা খান নাছির উদ্দিন মাহমুদ উপাধি ধারন করে রাজত্ব করতে থাকেন। ১৩২৪ সাল পর্যন্তলখনৌতির  স্বাধীনতা অক্ষুন্ন ছিল। ১৩২৪ সালে দিল্লীর গিয়াস উদ্দিন মুহম্মদ বিন তুঘলক লখনৌতির শাসনকর্তা বাহাদুর শাহকে পরাজিত ও বন্দি করে সমগ্র বাংলাদিল্লীর শাসনাধীনে আনয়ন করেন।

হাজী ইলিয়াস ১৩২৪ সালে লখনৌতির সুলতান আলাউদ্দিন আলী শাহকে হত্যা করে ফিরোজাবাদের (পান্ডুয়া) সিংহাসনে আরোহন করেন। তিনিই প্রথম সুলতানযিনি সমগ্র বাংলা দেশের অধীশ্বর হওয়ার গৌরব অর্জন করেন ( আবদুল করিম ১৯৯৯: পৃ.১৯৮) । তিনি উদার শাসন ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় জনসমর্থন লাভকরেন। তার রাজত্বকালে সুলতান ফীরুজ শাহ তুঘলক বাংলা  আক্রমণ করেন কিন্তু উভয়ের মধ্যে জয়পরাজয় অনির্ধারিত হওয়ার প্রেক্ষিতে ১৩৫৪ সালে এপ্রিল মাসেফীরুজ শাহ তুঘলক ও ইলিয়াস শাহের মধ্যে এক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফলে দিল্লী ও বাংলার মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়। এই বংশের শাসকদের মধ্যে সিকান্দারশাহ(১৩৫৮-১৩৯৩খ্রি:),গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ(১৩৯৩-১৪১০ খ্রি:),সাইফ উদ্দিন হামজা শাহ(১৪১০-১৪১২খ্রি:),শিহাব উদ্দিন বায়েজীদ শাহ(১৪১১-১৪১৪খ্রি:) এবংআলাউদ্দিন ফিরুজ শাহ (১৪১৪-১৪১৫খ্রি:) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বংশের প্রথম তিনজন শাসক খুবই যোগ্য ছিলেন (সুখময় মুখোপাধ্যায় ২০০০:পৃ.২৪০)।

ইলিয়াস শাহী সুলতানদের শাসনকালে জনৈক ওমরাহ রাজা গণেশের প্রভাব এত বেড়ে যায় যে তিনি কয়েকজন সুলতানকে ক্ষমতায় বসান এবং সরিয়ে দেন। একপর্যায়ে তিনিই ক্ষমতা দখল করেন। ফলস্বরুপ স্বল্পকালের জন্য ইলিয়াস শাহী বংশের (১৪১৪-১৪৩৬খ্রি:) শাসনকালের বিরতি ঘটে। রাজা গণেশ ও তার ইসলাম ধর্মেদীক্ষিত উত্তরাধিকারীরা ১৪৩৬ খ্রি: পর্যন্ত বাংলার শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল।

গণেশের বংশধর শামসুদ্দিন আহমদ শাহ(১৪৩৩-১৪৩৬খ্রি:) ফিরোযাবাদের সিংহাসন থেকে অপসারিত হন এবং ইলিয়াস শাহী বংশের নাসির খান নাসির উদ্দিনমাহমুদ শাহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। এই বংশের সুলতানদের শাসনকালকে পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বংশ বলা হয় (রমেশচন্দ্রমজুমদার১৯৯৮:পৃ.৫৪)।এ বংশেরসুলতানদের মধ্যে রুকন উদ্দিন বারবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪খ্রি:) ও শামস উদ্দিন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১ খ্রি:) নাম উল্লেখযোগ্য। ইলিয়াস শাহী বংশের শেষসুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহকে হাবশীরা হত্যা করলে বাংলায় ইলিয়াস শাহী বংশের অবসান ঘটে।

 ইলিয়াস শাহী বংশ সমগ্র বাংলায় একছত্র আধিপত্য বিস্তার করে প্রায় ১২০ ৰৎসরকাল বাংলা শাসন করে। এ বংশের শাসনব্যাবস্থায় স্থানীয়দের অংশগ্রহন, সংস্কৃতিপ্রীতি ও স্থাপত্য শিল্পের উৎকর্ষ সাধনে উ্জ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে (আবদুল করিম ১৯৯৯: পৃ.২৮৩) । উদার মনোভাবাপন্ন গৌড়েশ্বর সুলতান বারবক শাহ(১৪৫৯-১৪৭৪ খ্রি:) বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন(সুখময় মুখোপাধ্যায়২০০০:পৃ.৩৭৭)।

১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ খ্রি. বাংলায় চারজন হাবশী সুলতান প্রায় ছয় বৎসরকাল রাজত্ব করে। প্রত্যেক সুলতানই অস্বাভাবিভাবে মৃত্যবরণ করে (আবদুল করিম ১৯৯৯:পৃ.৩০১)। হাবশীরা আফ্রিকা মহাদেশের আবিসিনিয়া তথা ইথিওপিয়ার অধিবাসী ছিল। উল্লেখ্য সুলতান রুকন উদ্দিন বারবক শাহ ৮ হাজার হাবশী আমদানি করে।তাদেরকে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগদান করা হয়। সম্ভবত যুদ্ধবিগ্রহের প্রয়োজন ও স্থানীয় ব্যাক্তিবর্গের প্রাধান্য হ্রাসের উদ্দেশ্য ছিল (আব্দুল মমিন চৌধূরী ২০০৮: পৃ.১৩)। কিন্তু তারা সুলতানদের আস্থাভাজন হওয়ায় অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়। ফলস্বরুপ তারা ক্ষমতালিপ্সু হয়ে পড়ে এমনকি তারা বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে। অবশেষে উজীর সৈয়দ হোসেন কর্তৃক হাবশী বংশের শেষ সুলতান শামসুদ্দিন মুজাফ্ফর শাহ (১৪৯১-১৪৯৩ খ্রি:) নিহত হন এবং হাবশীশাসনরেও অবসান হয়।

১৪৯৪ খ্রি আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ( পূর্ব নাম সৈয়দ হোসেন) (১৪৯৪-১৫১৯ খ্রি:) বাংলার সিংহাসনে আরোহন করেন। তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের শাসনকে হোসেনশাহী (১৪৯৪-১৫৩৮খ্রি:) বংশ বলা হয়। অবিশ্বস্ত প্রাসাদ রক্ষী পাইকদের উচ্ছেদ,উদ্ধত হাবশীদের কর্মচ্যুত, গৌড় থেকে একডালায় রাজধানী স্থানান্তর এবং গোলযোগসৃষ্টিকারী অমাত্যদেরশাস্তিদান করে সুলতান   বাংলায় স্থিতিশীল শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন (মমতাজুর রহমান  ২০০১: পৃ.৪২) ।  বগুড়া জেলা তার শাসনধীনেআসে। এর পূর্বে পূর্ব বগুড়া প্রায় দীর্ঘ সময় প্রাগজ্যোতিষ রাজ্যের অংশ ছিল( ড. বেলাল হোসেন ২০০৮: পৃ.১৬)। তিনি তিব্বত ও বাংলার মধ্যে বাণিজ্য পথগুলিনিবির্ঘ্ন রাখার জন্য কামরুপ-কামতাপুর রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন এবং দীর্ঘকাল কামরুপ-কামতা হোসেন শাহী সুলতানদের অধীনে ছিল (মমতাজুররহমান ২০০১: পৃ.৪৮) । তার সময়ে বাংলা সর্বক্ষেত্রেসমৃদ্ধি অর্জন করে। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ সাহিত্যের একজন মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তার শাসনকালেস্থানীয় হিন্দুদের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে নিয়োগ দয়ো হয়। এই মহান শাসক ২৬ বৎসর রাজত্ব করে ১৫১৯ খ্রি: পরলোক গমন করেন। তার উত্তরাধিকারিদেরমধ্যে নসরত শাহ (১৫১৯-১৫৩২ খ্রি:), আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৫৩২-১৫৩৩ খ্রি:) এবং গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮ খ্রি:) প্রায় ৪৬ বৎসর বাংলায়রাজত্ব করেন। ১৫৩৮ খ্রি: সুলতান মাহমুদ শাহের প্রাণত্যাগের সাথে সাতে বাংলার স্বাধীন সুলতানির অবসান ঘটে। যা বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ যুগের সমাপ্তিনির্দেশ করে। (মমতাজুর রহমান ২০০১: পৃ.৭২)

 ১৫৩৮ খ্রি: এপ্রিল মাসে হোসেন শাহী বংশের শেষ সুলতান মাহমুদ শাহকে বিতাড়িত করে শের শাহ (১৫৩৯-১৫৪৫ খ্রি:) গৌড় অধিকার করলে বাংলায় আফগানশাসনের সূচনা হয়। শের শাহের উত্তরাধিকারী ইসলাম শাহের (১৫৪৫-১৫৫৩ খ্রি:) রাজত্বকাল পর্যন্ত বগুড়া জেলা দিল্লী সালতানাতের অধীন ছিল। কিন্তু ইসলামশাহের মৃত্যুর পর দিল্লীর সিংহাসন নিয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এসুযোগে বাংলার শুর আফগান শাসনকর্তা মুহাম্মদ খান সূর শামসুদ্দিন মুহম্মদ গাজী উপাধী নিয়েসিংহাসনে বসেন। তিনি স্বাধীনভাবে ১৫৫৫ খ্রি: পযর্ন্ত বাংলা শাসন করেন। পরে দিল্লীর সুলতান আদিল শাহের সেনাপতি কর্তৃক মুহম্মদ শাহ নিহত হন। কিন্তুকিছুদিনের মধ্যে শামসুদ্দিন শাহের পুত্র খিজির খান শাহবাজ খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহ (১৫৫৬ খ্রি: )উপাধী নিয়ে সিংহাসনে বসেন। তিনিপ্রায় ছয় বৎসর (১৫৫৫-১৫৬০ খ্রি:) এবং তার ভাই গিয়াস উদ্দিন জালাল শাহ প্রায় তিন বৎসর (১৫৬০-১৫৬৩ খ্রি:) বাংলার সিংহাসনে আসীন থেকে এজেলার ওপরকর্তৃত্ব বজায় রাখেন। তৃতীয় গিয়াস উদ্দিন নামক এক জবর দখলকারী গৌড়ের সিংহাসন দখল করেন। ১৫৬৪ খ্রি: পর্যন্ত বাংলার সিংহাসনে আসীন ছিলেন । কিন্তুবছর খানেক পরে তাজখান কররানী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ফলে বাংলায় কররানী বংশের শাসন শুরু হয়।

 কররানী বংশের শাসক প্রথম তাজ খান গৌড় বিজয়ের অল্পকাল পরই তার মৃত্যু হয়। তার ভাই সুলায়মান কররানী (১৫৬৫-১৫৭২ খ্রি:) মুঘল সম্রাট আকবরের সাথেসৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে স্বাধীনভাবে বাংলা ও বিহারের সিংহাসনে আসীন ছিলেন। তিনি বাংলার সুলতানদের মধ্যে  সর্বপ্রথম গৌড় ও পান্ডুয়া পরিত্যাগ করেতান্ডায় রাজধানী স্থাপন করেন ।তান্ডা গৌড়ের ২০/২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। মুসলিম শাসকদের মধ্যে সোলায়মান কররানীই সর্বপ্রথম উড়িষ্যা জয়করেন। তার দূরদর্শী উজীর লোদী খান ও সেনানায়ক কালাপাহাড় এর প্রচেষ্টায় তিনি এক বিরাট রাষ্ট্রের স্থাপয়িতা হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। সোলায়মানকররানী এজন দক্ষ,বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী শাসক ছিলেন। তার উত্তরাধিকারী দাউদ কররানী (১৫৭২-১৫৭৬ খ্রি) সিংহাসনে আসীন হওয়ার পরে মোগল সম্রাট আকবরেরআনুগত্য অস্বীকার করে। ফলে উভয়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়্ । অন্যদিকে আফগানদের মধ্যে দলাদলি শুরু হয়। এসুযোগে সম্রাট আকবর বাংলা আক্রমন করলেদাউদ কররানীকে সিংহাসন হারিয়ে মৃত্যু বরণ করতে হয়। বাংলায় কররানী বংশের শাসন শেষ হয়ে যায়।

১৫৭৬ খ্রি:সম্রাট আকবরের সেনাপতি খান জাহানের নিকট বাংলার শেষ স্বাধীন আফগান সুলতান পরাজিত ও নিহত হন। ফলে বাংলায় শুরু হয় মোগল শাসন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় তা পূর্ণতা পায়( আবদুল করিম ২০০৭: পৃ.২৫) । কিন্তু আকবরের সময়কালেই স্থানীয় আফগান ও হিন্দু জমিদাদের পরাজিত  করে বগুড়া জেলা তার শাসনাধীনে আসে।  আইন-ই-আকবরীতে বর্ণিত ঘোড়াঘাট সরকারের অন্তভূর্ক্ত ছিল  এজেলা। বর্তমানে ঘোড়াঘাট দিনাজপুর জেলায় অবস্থিত (প্রাগুক্ত, পৃ.১৬২)। ১৫৭৬ থেকে ১৭২৬ খ্রি: পর্যন্ত সুবা বাংলায় ২৯ জন সুবেদার ছিলেন; তাদের মধ্যে রাজা মানসিংহ(১৫৯৪-১৬০৬ খ্রি:), ইসলাম খান(১৬০৮-১৬১৩ খ্রি:), শাহজাদা সুজা (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রি:), মীর জুমলা (১৬৬০-১৬৬৩ খ্রি:), নবাব শায়েস্তা খান(১৬৬৩-১৬৭৮ খ্রি:) এবং নবাব মুর্শিদ কুলি খান (১৭০৩-১৭২৬ খ্রি:) প্রমুখ ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ।

বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে করতোয়া নদীর পশ্চিমে শেরপুর অবস্থিত। মধ্যযুগে সুবে বাংলার ইতিহাসে শেরপুর এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সে সময় বিদ্রোহীদের দমনে শেরপুরের গুরুত্ব ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। মোগল আমলে এ স্থান শেরপুর মুরচা বলে পরিচিত ছিল। ময়মনসিংহ জেলার শেরপুর হতে এ স্থানকে পৃথক দেখানোর জন্য মুরচা ব্যাবহার করা হয়েছিল(আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ২০১১: পৃ.৩১২) । শেরশাহ (১৫৩৯-১৫৪৫ খ্রি:) ও হুমায়ুনের সাথে যুদ্ধের সময় সম্ভবত:  শেরপুরে ছোট একটি দুর্গ নির্মীত হয়েছিল শেরশাহ কতৃর্ক( যদুনাথ সরকার ১৯৬৭: পৃ.১১৮) । সম্ভবত: শেরশাহের নামে শহরটির নামকরণ করা হয় (উইলিয়াম হান্টার, খন্ড-৮,১৮৭৬: পৃ.১৮৭) ।তবে তিনি নিজে বা তার পক্ষে কেউ শহরটি স্থাপন করেছিল তা স্পষ্ট নয়। মোগল সুবাদার শাহবাজ খা ঈসা খান ও তার অধীনস্থ মাসুম খাকে দমনের জন্যে প্রেরীত হন। পরবর্তীতে উভয়ের মধ্যে প্রচন্ড সংঘর্ষের পর রণক্লান্ত মোগল বাহিনী শেরপুর মুরচায় প্রত্যাবর্তন করে। রাজা মানসিংহ বঙ্গদেশের সুবাদার থাকা অবস্থায় এখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। শাহজাদা সেলিমের প্রতি সম্মান প্রর্দশনের লক্ষ্যে এ স্থানের নামরাখেন সেলিম গড়(আহমদ হাসান দানি১৯৬১:পৃ.১৭৫) । ১৬৬০ খ্রি: তদানিন্তন বাংলার পতুগীজ গভর্ণর ভনডেন ব্রুক বঙ্গদেশের একটি মানচিত্রে তিনটি প্রধান শহরের মধ্যে  একটি শেরপুর মুরচার নাম উল্লেখ করেছেন।  মানচিত্র অনুযায়ী একটি মহাসড়ক বোয়ালিয়া হয়ে রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া ও রংপুর জেলার মধ্য দিয়ে পূর্ব ও উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে আসাম পর্যন্ত পৌছেছে। রাস্তার তৎপাশে শেরপুর মার্টস এর কথা উল্লেখ আছে। মার্টস নি:সন্দেহে শেরপুর মুরচা বুঝায়।

বগুড়া জেলা মোঘলদের শাসনাধীনে প্রায় দুই শত বৎসর ছিল। কিন্তু সম্রাট আওরঙ্গজেবের পর দিল্লীর অকমর্ণ্য সম্রাটগণের সময়ে নিযুক্ত মুর্শিদকুলী খান( ১৭১৭-১৭২৭ খ্রি:) স্বাধীনভাবে শাসন কার্য চালান। তখন থেকে শুরু হয় বংশানুক্রমিক নবাবী শাসন। মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর পরবর্তী নবাবগণ সুজাউদ্দীন খান (১৭২৭-১৭৩৯ খ্রি:), নবাব সরফরাজ খান(১৭৩৯-১৭৪০ খ্রি:), নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রি:) ও সিরাজ উদ্দৌলা (১৭৫৬-১৭৫৭ খ্রি:) নামেমাত্র মোগল সম্রাগণের অনুগত ছিলেন এবং তাদেরকে কিছু কর প্রদান করতেন। কিন্তু সাধারন ও রাজস্ব প্রশাসনে নবাবের ক্ষমতা ছিল নিরংকুশ। তাদের সময় হতে মুর্শিদাবাদ রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।

মুর্শিদকুলী খান বাংলায় একটি উন্নত ধরনের রাজস্ব পদ্ধতি প্রবর্তন করে জমিদারী প্রথার আমুল সংস্কার করেন। তার নীতি অনুসৃত করে জেলার দক্ষিণ-পূর্বভাগের পরগণাগুলো নাটোর রাজ্যের, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চালের পরগণাগুলো দিনাজপুর রাজ্যের এবং মধ্যবর্তী ভূভাগ শিলবর্ষ পরগণাটি  তিনজন জমিদারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।

শেলবর্ষ পরগণাটি সরকার বাজুহার অন্তগর্ত ছিল। শেলবর্ষ জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সৈয়দ আহমদ। শেলবর্ষ পরগণার প্রাক্তন চৌধুরী দুনিচাঁদের রাজস্ব অনাদায়ে সম্রাট আওরঙ্গজেব সৈয়দ আহমদকে অত্র পরগণার চৌধুরীর সনদ প্রদান করেন(মো:মাহবুবুর রহমান, মুহ.মমতাজুর রহমান সম্পাদিত ২০০৯: পৃ.৮৮৯)। ১৬৭৫ খ্রি: হতে বগুড়ার এই প্রাচীন জমিদারি চালু হয়( রজতকান্ত রায়,  ২০০৫: পৃ.১১৫) । ৩০,০০০ টাকা সেলামী গ্রহণে সৈয়দ আহমদের নামে পরগণা মঞ্জুর করা হয় এবং ইহার খাজনা নির্ধারিত হয় ৩৭,২০৩ টাকা( কাজী মিছের ২০০৭: পৃ.১০৯) । সৈয়দ আহমদের চারজন স্ত্রী ছিল।যথা- মুন্ন বিবি, ফুন্ন বিবি, পরি(প্যারী) বিবি এবং দুনী বিবি। ৩য় ও ৪র্থ বিবি নি:সন্তান ছিলেন । প্রথম স্ত্রীর রওশন বিবি নামক এক কন্যা এবং ২য় স্ত্রীর হুরী ও রাজা নামের দুই কন্যা ছিল। সৈয়দ আহমদের মৃত্যুর সময় দুই কন্যা জীবিত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ঘোড়াঘাটের কাজীর মধ্যস্থতায় পিতার জমিদারির সাত আনা অংশ রওশন বিবি এবং নয় আনা অংশ হুরী বিবি প্রাপ্ত হন। জমিদারির সাত আনি কাথহালি ও নয় আনি কুন্দ্রগ্রামে বিভক্ত হয়।সৈয়দ আহমদ ১৬৯৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। বগুড়া জেলা এসময় ঘোড়াঘাটের অন্তভূক্ত ছিল।

বগুড়া শেলবর্ষ পরগণার জমিদার বংশের প্রতিনিধি তহুরুন্নেসা ও তার স্বামী নবাব আব্দুস সোবহান চৌধুরী বগুড়া মোকাম থেকে বর্তমান স্থানে বগুড়া শহর গঠনে মূখ্য ভূমিকাপালন করেন(মো: সাজ্জাদুর রহমান ১০১৩: পৃ.১২)। আব্দুস সোবহাস চৌধুরী বগুড়ায় প্রজাবর্গের মঙ্গল ও উন্নতি সাধনার্থে কর্ম করার জন্য বৃটিশ সরকার তাকে  ১৮৯৪ সালে নওয়াব খেতাব প্রদান করেন। ( আব্দুর রহিম বগরা১৯৯৯: পৃ.৯) নওয়াব আব্দুস সোবহান চৌধুরীর একমাত্র  কন্যা আলতাফুন্নেসার সাথে টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ীর জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর বিয়ে হয়।ছেলে সন্তান না থাকায় আব্দুস সোবহান চৌধুরী তার জমিদারিকে ওয়াকফ এস্টেটে রুপান্তরিত করেন।সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর একমাত্র পুত্র ছিলেন সৈয়দ আলতাফ আলী চৌধুরী ।আলতাফ আলী চৌধুরী এই এস্টেটের প্রথম মুতাওয়াল্লী নিযুক্ত হন। আলতাফ আলী চৌধুরীর ছিল চার পুত্র। তারজ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ওয়াকফ এস্টেটের ২য় মুতাওয়াল্লী নিযুক্ত হন । তিনি পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী (১৯৫৩-১৯৫৫)নিযুক্ত হয়েছিলেন।সাত আনি অংশেরজমিদারির উত্তরাধিকারী সৈয়দ জগজ্জমা চৌধুরী কাথহালি থেকে উঠে এসে বগুড়া শহরের করতোয়া নদীর তীরে কাছারি বাড়ি নির্মাণ পূর্বক তথায় বসবাস করতে থাকেন। তার জামাই আবুল হোসেন সাহেব বগুড়ায় ‘রাজা সাহেব’ নামে খ্যাত হন। তার নামানুসারে বগুড়ার একটি বাজার ‘রাজাবাজার’ নামকরণ করা হয়। নয় আনি অংশের জমিদারির উত্তরাধিকাকারীরাও করতোয়া নদীর তীরে কাছারী নির্মাণ করে ।এসময় কুন্ডগ্রামের বাজার ( বর্তমানে ফতেহ আলীর বাজার) নামক একটি বাজার স্থাপিত হয়। ইহার পর হতে ক্রমে ক্রমে বগুড়া একটি শহরে পরিণত হয়।

 মুর্শীদকুলী খান ১৭২৭ খ্রি: মৃত্যুবরণ করেন। তার উত্তরাধীকারীদের আমলে এ জেলার ইতিহাস স্থানীয় জমিদারদেরকে কেন্দ্র কের গড়ে উঠে। মুসলমান শাসনামলের শুরু থেকে ১৭৫৭ খ্রি: পর্যন্ত সময়কালেক এ জেলার ইতিহাসকে শান্তি ও প্রগতির যুগ বলে চিহ্নত করা যেতে পারে।

 সুবে বাংলার ইতিহাসে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই যুদ্ধে লর্ড ক্লাইভকর্তৃক বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হন এবং কোম্পানীকে বৃটিশ শাসনের গোড়াপত্তনের সুযোগ করে দেয়। ১৭৬৫ সালে কোম্পানী দিল্লীর সম্রাট শাহ আলমের নিকট হতে সুবে বাংলার দিওয়ানী লাভ করে। কোম্পানী দেওয়ানী লাভের ফলে এদেশের প্রশাসনে কোন তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হয়নি। কারন কোম্পানী উদ্বৃত্ত রাজস্ব নিয়ে সন্তষ্ট ছিল। জমিদাররা বৎসরে নিজ নিজ এলাকায় সরকারী কোষাগারে টাকা জমা দেওয়ার জন্য দায়ী থাকতেন। কিন্তু অনেক সময় জমিদাররা রাজস্ব জমাদানে ব্যর্থ হতেন। এরই প্রেক্ষিতে লর্ড কর্ণওয়ালিশ কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হলে অনেক প্রাচীন জমিদারী ধ্বংপ্রাপ্ত হয়।

 বৃটিশ শাসন সূত্রপাতের মাত্র কয়েক বছর পরই অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তাদের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ফকির ও সন্ন্যাসীদের এক বিদ্রোহ  ঘটে (সুপ্রকাশ রায় কলকাতা ২০১২: পৃ.২০) । এই বিদ্রোহ ইতিহাসে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এর স্থায়িত্বকাল ছিল ১৭৬৩ হতে ১৮০০ খ্রী: পর্যন্ত। তৎকালীন ইংরেজ শাসকদের লিখিত পত্রাবলী ও রিপোর্টে এ বিদ্রোহকে সন্ন্যাসীদের আ্ক্রমণ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আবার কেউ একে রাষ্ট্র বিপ্লব ও অরাজকতার সুযোগে অনেকে দলবদ্ধভাবে দস্যুবৃত্তির প্রাদুর্ভাব বলে অভিহিত করে(রমেশচন্দ্র মজুমদার১৯৭১: পৃ.২২)। ভারতের প্রথম গভর্ণর জেনারেল হেস্টিংসই প্রথম ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কৃষক বিদ্রোহ হিসেবে অভিহত করেন। তিনি একে হিন্দুস্তানের যাযাবরদের পেশাদারী উপদ্রব ও ডাকাতি বলে ব্যাখ্যা করেন। বৃটিশ সরকারী প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা রায় সাহেব যামিনীমোহন ঘোষের গ্রন্থে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে বিহার ও বাংলার বাহির হতে আসা যাযাবর প্রকৃতির নাগাসন্ন্যাসী, ভোজপুরী দস্যু ও ডাকাতদের আক্রমণ ও উৎপাত হিসেবে অভিহিত করেন। ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড থমসন ও জি.টি. গ্যারেট তাদের গ্রন্থে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে আজিও রহস্যাবৃত্ত ও এর রহস্য উদঘাটনের জন্য ভারতবাসীর প্রতি আহবান জানান( এডওয়ার্ড থমসন ও জি.টি.গ্যারেট পৃ.১২৭) । ডব্লিউ.হান্টার তার গ্রন্থে লিখেছেন যে, বিদ্রোহীরা ছিল মুসলিম সেনাবাহিনীর বরখাস্তকৃত সৈন্য যারা দলবেধে সর্বত্র ঘুরে বেড়াত চুরি ও লুটতরাজ করত( ওসমান গনি ২০০২: পৃ.৫৬-৫৭)। সরকারী ইতিহাস ও গেজেটীয়ার রচয়িতার অন্যতম সরকারী কর্মকর্তা এল.এস.এস. ও ম্যালী তার গ্রন্থে বিদ্রোহীদের ধ্বংসপ্রাপ্ত মুঘল সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী ও সর্বশান্ত কৃষক বলে অভিহিত করেন(এল.এস.এস.ও ম্যালী ১৯২৫:পৃ.২০৭ )।ধ্বংপ্রাপ্ত মুঘল সেনাবাহিনীর সংখ্যা প্রায় বিশ লাখ এবং এর সাথে যুক্ত হয়েছিল জমি হতে উচ্ছন্ন-সর্বশান্ত কৃষক ও কারিগরগণ(প্রাগুক্ত,পৃ.২০৭)।

 ‘দাবিস্তান’ নামক গ্রন্থ এবং ঘটনাপঞ্জী আকারে লিখিত অপর দুইখানি গ্রন্থে দেখা যায় যে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে সমগ্র উত্তর ভারেত মারাঠা সম্প্রদায়ভূক্ত ‘গোসাই’, শৈব সম্প্রদায়ভূক্ত ‘নাগা’,’পূর্বিয়া’ ‘বকসিয়া’’ভোজপুরী’ প্রভৃতি এবং মাদারী সম্প্রদায়ভূক্ত বিভিন্ন দলের ফকিরেরা দল বেধে ঘুরে বেড়াত(সুপ্রকাশ রায় ২০১২: পৃ.২০) । এসব ফকির-সন্ন্যাসীরা ইংরেজ শাসনের গোড়ার দিকে বাংলা ও বিহারের ওপর আক্রমণ ও জনসাধারনের সম্পদ লুন্ঠন করত তার স্পষ্ঠ কোন উল্লেখ নাই ঐসব গ্রন্থে। ইংরেজদের নথিপত্রে প্রতিফলিত হয়েছে যে, জনসাধারনের এক বড় অংশের উপর তাদের প্রভাব ছিল এবং বৃটিশ বিরোধী চরিত্রে জমিহারা,কারিগররা এবংসর্বহারাদের সহানুভূতি ও সহযোগিত অর্জন করেছিল (কৃষ্ণ ধর, ১৯৯৭: পৃ.৭) । বৃটিশ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এটিই ছিল প্রথম সশস্ত্র প্রতিবাদ।

 ফকির সম্প্রদায় তাদের নেতা মজনু শাহের নেতৃত্বে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। ১৭৬৩ থেকে ১৭৮৭খ্রি: পর্যন্ত মজনু শাহের কর্মকান্ড ছিল বগুড়া অঞ্চলে। মহাস্থান গড়ের ভেতরে ছিল মজনু শাহের মুল ঘাটিঁ। মজনু শাহ ফকির সম্প্রদায় শাহ-ই-মাদার সিলসিলার অন্তভূর্ক্ত ছিল (মুহম্মদ আবু তালিব ২০০৪: পৃ.৫০)। প্রায় ২৫ বৎসরব্যাপী তার সংঘাতময় কর্মজীবনের সমাপ্তি পূর্ব পর্যন্ত উত্তর বাংলার জেলাসমূহে এবং পূর্ব বাংলার ঢাকা ও ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। মজনু শাহের দু:সাহসী ও ঘন ঘন আক্রমণে ইংরেজ কেম্পানী শাসকরা উদ্বিগ্ন ছিল(যামিনী মোহন ঘোষ ১৮৩০: পৃ.৯১)। 

মজনু শাহ ও তার খলিফাগণ কোম্পানী শাসকদের সাথে কয়কেবার খন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হন। মজনু শাহ ১৭৭১খ্রি: ঘোড়াঘাটে (দিনাজপুর) লে:ফোল্টহাম ও লে:টেলরপরিচালিত ইংরেজ সেনাবাহিনীর সাথে লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে মহাস্থান গড়ে আশ্রয় গ্রহন করেন।মজনু শাহ এখানে একটি সাময়িক সেনানিবাস তৈরী করে এখানথেকে বিদ্রোহ পরিচালনা করেন। দিনাজপুরস্থ প্রাদেশিক রাজস্ব পরিষদের নিকট লিখিত শেলবর্ষের(বগুড়া)কালেকক্টর ফ্রান্সিস গ্লাডউইনের প্রেরিত পত্রে উল্লেখিতহয়েছে যে, ১৭৭৬ সালে মহাস্থান গড়ে মজনু শাহ একটি দুর্গ নির্মাণ করেন(যামিনীমোহনঘোষ১৮৩০: পৃ.৭২-৭৩)। মহাস্থান গড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষের মধ্যেঅবশ্য তার সেনানিবাসের নির্দশন পাওয়া যায়নি। সম্ভবত: সেনানিবাসটি সাময়িকভাবে নির্মিত হয়েছিল।

    ১৮৬১ সালে বগুড়াবঙ্গবিদ্যালয়ের( বর্তমানে বগুড়া পৌর উচ্চ বিদ্যালয় যা বাংলা স্কুল নামে পরিচিত) শিক্ষক শ্রী কালীকমল সার্বভৌম কর্তৃক রচিত বাংলা ভাষারপ্রথম স্থানীয় ইতিহাস গ্রন্থ ‘সেতিহাস বগুড়ার বৃত্তান্ত’ হতে জানা যায় যে, বগুড়া শহর হতে ৬ ক্রোশ (১২ মাইল) দক্ষিণে গোয়াইলের নিকট মাদারগঞ্জে মজনু শাহেরস্থানীয় দফতর ছিল (শ্রী কালীকমল সার্বভৌম রচিত ড.রতন লাল চক্রবর্তী সম্পাদিত  ২০১১: পৃ.৯৯)। ১৭৭৬ খ্রি: ১৪ই নভেম্বর বগুড়ার সন্নিকটে লে:রবার্টসনের সাথেএবং ১৭৮৪ খ্রি:মহাস্থানের নিকটে লে: ক্রো এর সাথে মজনু শাহ ও তার দলের  ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘঠিত হয় বলে জানা যায়। সমকালীন জমিদাররা ফকির আন্দোলনেরবিরোধী ছিলেন। তারা মজনু শাহের গোপন গতিবিধি কোম্পানী শাসকদের জানিয়ে দিতেন। এদের মধ্যে বগুড়া জেলার কড়াই গ্রামের জমিদার শ্রী কৃষ্ণ চৌধুরী যারমুমিনশাহী ও জাফরশাহী পরগণায় প্রচুর ধনসম্পত্তি ছিল। বগুড়া জেলার টেপা ঝাকৈরের বাসিন্দা শ্রী কৃষ্ণ আচার্য যার ময়মনসিংহের আলেপসিং পরগণায় প্রচুর ভূ-সম্পত্তি ছিল (মুহম্মদ আবু তালিব ২০০৪: পৃ.৬০)। ১৭৮৬ খ্রি: লে: ব্রেনান মজনুর বগুড়ায় আগমনের খবর পেয়ে তার পিছু নেন। শেলবর্ষ (বগুড়া) থেকে ২০ মাইলকালেশ্বর নামক স্থানে দুদলের মুখোমুখি যুদ্ধে মজনু বাহিনী চরম বিপর্যয়ের সম্মুখিন হয়। যুদ্ধে মজনুর দল পরাজিত ও বিতাড়িত হয় । মজনু শাহ গঙ্গা নদী পার হয়েবিহারে উপস্থিত হন । সরকারী সূত্রে জানা যায় কানপুর জেলার মাখনপুর এলাকায় আনুমানিক  ১৭৮৭ খ্রী: তার কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। মজনু শাহের মৃত্যুরপর তার যোগ্য শিষ্য মুসা শাহ ও মজনু শাহের পালিত পুত্র চেরাগ আলী শাহ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত কোম্পানী শাসনের বিরোধীতা অব্যাহত রাখেন।

  অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে বগুড়া জেলায় নাগা সন্ন্যাসীদের লুন্ঠনমুলক তৎপরতা শুরু হয়। পন্ডিত শাহের নেতৃত্বে সন্ন্যাসীদের তৎপরতার ফলে এ জেলায়উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত নৈরাজ্য ও বিশৃংঙ্খলা অব্যাহত থাকে।বগুড়া শহর হতে দক্ষিণাস্থিত মাঝিড়া গ্রামে পন্ডিত শাহের প্রধান আড্ডা ছিল( প্রভাস চন্দ্র সেন,২০০০: পৃ.১৩৭-১৩৮)। এছাড়াও গোহাইল গ্রাম ও শহরের উত্তর দিকস্থ কালীতলা হাটে সন্ন্যাসীদের উঠাবসা ছিল। ১৭৮৬খ্রি: বগুড়ার কালেক্টর মি: চ্যাম্পিয়নের একপত্রে জানা যায় যে, ১৭৭৭ খ্রি: কোন এক সময়ে চাম্পাপুকুরে ফকির কাটাখালের পাশে ফকির ও সন্ন্যাসীদের মধ্যে এক ভয়ানক দাঙ্গা সংঘঠিত হয়। যাহোক ১৮৮০খ্রি: কোম্পানীর শাসকগণ এদের দমন করতে সচেষ্ট হন। ১৮০০ থেকে ১৮১২ খ্রি: পর্যন্ত প্রায় ১২ বৎসরব্যাপী পন্ডিত শাহ ও তার দলবলের লুন্ঠন ও নির্যাতনমুলককার্যে জেলার জনগন উৎপীড়িত ছিল(প্রাগুক্ত, পৃ.১৩৭-১৩৮)। ১৮১২সালে শেলবর্ষ পরগণার জমিদার সৈয়দ আসাদুজ্জামান পন্ডিত শাহকে ধরিয়ে দিয়ে রাজশাহীম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরন করেন।তথায় বিচারে তাকে দেশান্তরিত আদেশ দেয়া হয়। ঐ সময়  বগুড়া জেলা রাজশাহীর অন্তভূর্ক্ত ছিল।

মজনু শাহের সহযোগীদের মধ্যে ভবানী পাঠক অন্যতম ছিলেন। ১৭৮৭ খ্রি: মাঝামাঝি সময়ে ভবানী পাঠক নামের একজন শীর্ষ স্থানীয় সন্ন্যাসী নেতাকে দমনের জন্যলে: ব্রেনানকে নিয়োগ করা হয়। মি: ব্রেনান তার রিপোর্টে ভবানী পাঠকের সহযোগী হিসেবে দেবী চৌধুরানীর নাম উল্লেখ করেছেন। যিনি নৌকায় বাস করেন এবংসুযোগ পেলে নিজে আথবা ভবানী পাঠকের সাথে মিলে ডাকাতি করতেন। যাইহোক মি: ব্রেনান বহ সৈন্যসহ ভবানী পাঠকের উপর আকশ্মিক আক্রমণ করে তারকতিপয় অনুচরকে নিহত ও বন্দী করেন। আবশেষে কোম্পানী এসব ডাকাতদের দমন করে এজেলায় শান্তি শৃংঙ্খলা স্থাপন করতে সমর্থ হয়।

 ফকির ও সন্ন্যাসীদের আন্দোলন ও তৎপরতার ফলে  বগুড়া জেলার যথেষ্ঠ ক্ষতি হয়।অত্র অঞ্চলের সুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ ও পরিস্থিতির উন্নয়নের প্রয়োজন ছিল। করতোয়ারপূর্ব পারে নীলকরদের নীল চাষ ও ইউরোপীয়দের স্থাপিত বসতিগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়( ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ১৮৭৫: পৃ.১৩০)।কোম্পানী শাসনের পূর্বে জমিদারদের সময় বর্তমান বগুড়া শহরের বিস্তীর্ণ জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। এসব অরণ্যাদিতে বড় বড় ডাকাতদের কেন্দ্রভূমি হিসেবে গড়েউঠেছিল(কাজি মিছের ২০০৭: পৃ.১৮০)। এমতাবস্থায় স্থানীয় গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ রাজশাহী জেলা কর্তৃপক্ষের বরাবরে আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ স্বতন্ত্র জেলা প্রতিষ্ঠারপ্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। এরই প্রেক্ষিতে ১৮২১ সালে রাজশাহী হতে আদমদিঘী,শেরপুর,নখিলা ও বগুড়া থানা, রংপুর জেলা হতে দেওয়ানগঞ্জ ও গোবিন্দগঞ্জএবং দিনাজপুর জেলা হতে লাল বাজার, ক্ষেতলাল ও বদলগাছী থানা নিয়ে বর্তমান বগুড়া জেলা গঠিত হয়(প্রভাস চন্দ্র সেন: ২০০: পৃ.৩৩০):

  ইংরেজ কোম্পানী বগুড়া জেলায় উপনিবেশ স্থাপনের পর নীল চাষের উপযোগী দেখে নীল চাষ আরম্ভ করে। প্রচুর পরিমাণ নীল উৎপন্ন হওয়ার দরুন বহু সংখ্যকনীল কারখানা ও কুঠি গড়ে উঠেছিল।১৮৬১ সালের দিকে বগুড়ায় চারটি প্রধান নীলকুঠি ছিল। যথা-সারিয়াকান্দি,মাদারগঞ্জ,বেগুনী ও বনোওয়ারিগঞ্জ(মহীপুর) (শ্রীকালিকমল সার্বভৌম, ২০১১ পৃ.৪০)। মানস নদীর তীরে ধুনট ছিল নীলের সবেচয়ে বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র। নীল চাষ আরম্ভ হওয়ার পরবর্তীকালে চাষীদের ওপরঅত্যাচার ও শোষণের মাত্রা যুক্ত হওয়ার পর এ জেলার সারিয়াকান্দি থানার প্রতিপত্তিশালী কৃষ্ণ প্রসাদ রায় নামক ব্যাক্তির নেতৃত্বে প্রজাগণ নীলকর সাহেবদেরবিরুদ্ধে আন্দোলন হাঙ্গামার জেরে ফার্গুসন নামক নীলকর নিহত হয় (প্রভাস চন্দ্র সেন ২০০০:পৃ.৩৭৯)। এক পর্যায়ে কোম্পানী ব্যবসা গুটাতে বাধ্য হয় এবং ১৮৬২সালের মধ্যে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।

 উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যেতরীকা-ই-মোহাম্মদীয়াও ফরায়েযী   নামক দুটি ইসলামী সংস্কার আন্দোলন গড়ে উঠে। এ দুটি সংস্কারআন্দোলন দ্বারা বগুড়া জেলার লোকেরা খুবই প্রভাবিত হয়। সংস্কারের নিমিত্তে আন্দোলন দুটি পরিচালিত হলেও পরবর্তীতেতা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে রুপ নেয়।

উত্তর ভারতের সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী (১৭৮৬-১৮৩১খ্রি:) তরীকা-ই-মোহাম্মদীয়া নামক সংস্কার আন্দোলন চালু করেন। মুসলমান সমাজের লোকদের মধ্যে কোরানও নবীজীর মূল সুন্নতের প্রতি উৎসাহিত করা এবং কুসংস্কার ও অনৈসলামিক রীতিনীতি থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যে তিনি তরীকা-ই-মোহাম্মদীয়া আন্দোলন গঠনকরেন। এটি একটি জেহাদী আন্দোলন। যদিও এটি ভারতের তথাকথিত ওহাবি আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ বলে পরিচিতি পায় (ড.মুহম্মদ ইনাম উল হক ১৯৯৩: পৃ.২৫)। ১৮২৬ সালে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী ও তার বিশ্বস্ত মুরীদ শাহ ইসমাইল বৃটিশ ভারতের উত্তর- পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে প্রধান কেন্দ্র স্থাপন করেন এবং উদ্ধত ওঅত্যাচারী শিখদের বিরুদ্ধে প্রথম জেহাদ আরম্ভ করেন। বগুড়া জেলার অধিবাসিরা জেহাদ আন্দোলনে সাড়া দেয় এবং জিহাদের জন্য লোক ও অর্থ সংগৃহীত হয়।সোন্দা বাড়িতে আবদুল করিম সাহেবের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্র গড়ে উঠে। এ আন্দোলনে পুরোভাগে যারা ছিলেন তারা হলেন আলে মোহাম্মদ সরকার,  বিলায়েতআলী, ফকির হাজী ছমিরউদ্দিন,  রণ মাহমুদ তরফদার ও ইব্রাহিম মন্ডল প্রমুখ অন্যতম (এ.জে.এম.সামছুদ্দীনতরফদার১৯৭০: পৃ.১৩২)।

 বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার হাজী শরিয়ত উল্লাহ(১৭৮১-১৮৪০খ্রি:) ও তার ছেলে মুহম্মদ মহসিন ওরফে দুদু মিয়ার(১৮১৯-১৮৫৭খ্রি:) নেতৃত্বে ফরায়েযীআন্দোলন চলে। এ আন্দোলন প্রথমে ধর্মীয় সংস্কাররুপে আরম্ভ করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি তার শিষ্যদিগকে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য শোষণ হতে রক্ষা করার জন্য সচেষ্টহয়েছিলেন। এক পর্যায়ে ফরায়েযী আন্দোলন রাজনৈতিক সংগ্রামে তথা হাজার হাজার কৃষকের সংঘবদ্ধ একটি আন্দালনে রুপান্তরিত হয়(ড. মুঈন-উদ-দীন আহম্মদখান২০০৭:পৃ.৫৫-৫৬)।বগুড় জেলার কৃষক,তাতী,তেলী প্রভৃতি সম্প্রদায়ের নিকট এ আন্দোলন খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বৃটিশ শাসনের সমর্থক স্থানীয় হিন্দুজমিদারদের বিরুদ্ধে ফরায়েযীদের অবিরাম সংগ্রাম জেলার চাষী সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করে।

  ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় বগুড়া জেলার অভ্যন্তরীন প্রশাসন গুরতর কোন সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। তবে সিপাহী বিদ্রোহী সম্পর্কিত গুজব ছড়িয়ে পড়লেজেলা কতৃপক্ষ ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়(রতন লাল চক্রবর্তী ১৯৮৪: পৃ.৭৪) । বিদ্রোহীদের করাগার ভেঙ্গে কয়েদীদের মুক্তকরণ, কোষাগার ও স্ট্যাম্প পেপার লুন্ঠন সিপাহীবিদ্রোহের তৎপরতার অংশ ছিল। এজন্য জেলার কোষাগারের নিরাপত্তাবিধানে কোম্পানী কতৃপক্ষের উদ্বেগ লক্ষ্য করা যায়(রতনলালচক্রবর্তী১৯৯৩:পৃ.২৩৫)।কোম্পানীর উপর নির্ভরশীল স্থানীয় জোতদার,জমিদার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী কোম্পানীকে সর্বাত্নক সহযোগিতা প্রদান করে। অবশ্য এ সহযোগিতার মূলে ছিল শ্রেণী স্বার্থআদায়। ফলস্বরুপ সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এ বিদ্রোহের ফলে কোম্পানী প্রশাসনে আমুল পরিবর্তন ঘটে ১৮৫৮ সালে নভেম্বরে রাণী ভিক্টোরিয়ার একরাজকীয় ঘোষণায় এ জেলাসহ ভারতের শাসন ক্ষমতা স্বহস্তে গ্রহণ করেন। এর ফলে কোম্পানি  শাসনের অবসান ঘটে।

১৮৭৩ এর সিরাজগঞ্জ ও পাবনা বিদ্রোহ ছিল  জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক প্রজা বিদ্রোহ সংঘঠিত হয় যা পাবনা বিদ্রোহ নামেও পরিচিত। প্রজাস্বত্ত্ব হরন,খাজনা বৃদ্ধি, আবওয়াব বৃদ্ধি প্রভৃতি কারনে প্রজারা কর দিতে অস্বীকার করলে জমিদার ও প্রজাদের মধ্যে সংর্ঘষ ঘটে। পাবনা বিদ্রাহের প্রভাবে বগুড়া জেলাতেওকৃষকগণ উদ্ধুদ্ধ হয়ছিল। বগুড়া জেলার নওখিলা প্রজাগণ দিঘাপতিয়া রাজার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদমুখী হয়ে উঠে (গ্রাম বার্তা প্রকাশিকা প্রত্রিকা,১৩-০৯-১৮৭৩)।

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের আমলে (১৮৯৯-১৯০৫খ্রি:)বঙ্গ ভঙ্গ হলে বগুড়া জেলা পূর্ব বঙ্গ ও আসাম প্রদেশের অন্তভূর্ক্ত হয়( ড.নুরূল ইসলাম মঞ্জুর ২০১০: পৃ.৩৬)।মুসলমানদের ভাগ্যোন্নয়ন ও প্রশাসনিক সুবিধার প্রেক্ষিতে মুসলমান বণিক ও শহুরে মধ্যবিত্তদের নিকট বঙ্গভঙ্গ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এর  ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিকঅবস্থা মুষলমানদিগকে একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহনে উৎসাহিত করে। যার ফলে ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ গঠিত হয়।জেলার পরবর্তী রাজনৈতিককার্যকলাপ মুসলিম লীগের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। মুহম্মদ আলী জিন্নার নেতৃত্বে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ সক্রিয় হয়ে উঠলে বগুড়াতে ইহা দুর্বার শক্তিঅর্জন করে এবং বৃটিশ ও কংগ্রেসের আপত্তিকর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহন করে ( কাজি মিছের, পৃ.১৭০)।১৯৩৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীরবগুড়ায় আগমন করলে নওয়াব প্যালেসে শহরের গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গদের নিয়ে মুসলিম লীগের একটি শক্তিশালী কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়। পাকিস্তানের প্রাক্তনপ্রধানমন্ত্রী মহম্মদ আলী ইহার সভাপতি, মওলবী নবির উদ্দিন তালুকদার ও জনাব আবদুস সাত্তার যথাক্রমে ইহার যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। জনাব মুহম্মদ আলী,মজিবর রহমান, মোজাহার হোসেন, ডা: কসির উদ্দিন তালুকদার ও সিরাজুল হক প্রমুখ নেতৃবৃন্দের প্রচেস্টায় মুসলিম লীগের কর্মকান্ড জোরদার হয়। মুসলিম লীগেরপূর্ব ও পশ্চিম-বগুড়া নামে দুটি শাখা ছিল।

 ১৯১৪-১৯১৯সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ তথা মিত্র শক্তির হাতে তুরষ্কের পরাজয়ের ফলে তুরষ্ক বিভক্ত করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলমানগণ  খেলাফতেরমর্যাদা রক্ষাকল্পে খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেয়। সৈয়দ আব্দুল করীম দাউদীর চেষ্টায় খিলাফত আন্দোলন বগুড়া জেলায় বিস্তার লাভ করে (মো: রফিকুল ইসলাম২০১০: পৃ,৮৬)। ১৯১৭ সালে এ জেলায় যথাক্রমে ডা:আলি ও আসরাফ আলির নেতৃত্বে খেলাফত কমিটি গঠিত হয়। খেলাফত আন্দোলনের সময় বৃটিশ সরকারেরনিপীড়নমূলক কার্যকলাপের  বিরুদ্ধে মহাত্না গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবংখেলাফত আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দান করেন।এই অসহযোগ কর্মসূচীরমধ্যে ছিল বৃটিশ খেতাব ও পণ্য এবং আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহ বর্জন ও স্বদেশী বস্ত্র ব্যবহার। এজেলায় এসব কর্মসূচী বাস্তবায়নে সাড়া পরে যায়। বাবু সুরেশচন্দ্র দাশগুপ্ত ও যতীন্দ্র মোহন রায় এ আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন। অত্র জেলায় ২৪টি হাই স্কুল ও বহু মক্তব মাদ্রাসার পাঠক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।  ১৯২১ সালেঅসহযোগ আন্দোলন এখানে জোড়ালো হয়( তাজ উল ইসলাম হাশমি ১৯৯৪: পৃ.৭০ ) ।

 খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার পর ডা: সৈইফ উদ্দীন কীচলুর প্রতিষ্ঠিত ‘তানজিম’ আন্দোলন মৌলভী এছহাক উদ্দীন এর নেতৃত্বেবগুড়া জেলায় গড়েতোলার চেষ্টা করা হয়। ডা: সৈইফ উদ্দিন কীচলু তানজিম আন্দোলন জনপ্রিয় করার জন্য এজেলায় আগমন করেন এবং তাকে আট হাজার টাকার একটি তোড়াউপহার দেওয়া হয়।

 জমিদার মহাজনদের অমানুষিক অত্যাচারের হাত হতে কৃষক প্রজা সাধারনের মুক্তি সাধনকল্পে ১৯২২ সালে জনাব রজিব উদ্দিন তরফদারের নেতৃত্বে এ জেলায় প্রজাআন্দোলনের গোড়াপত্তন হয় (এ.জে.এম.সামছুদ্দীনতরফদার১৯৭০:পৃ.১৩৫)। আসাম ও যুক্ত বাংলার জনসাধারন তাকে ‘প্রজা বন্ধু’ আখ্যায় আখ্যায়িত করে। বগুড়াশহরে বঙ্গীয় প্রজা সম্মেলন কয়েকবার অনুষ্ঠিত হয়। ১৯২৯ সালে বঙ্গীয় প্রজা সম্মেলন উপলক্ষে বগুড়ায় মৌলানা আকরাম খা ও কাজী নজরুল ইসলাম আগমনকরেন। বগুড়ার এডওয়ার্ড হলে প্রজা কনফারেন্সের এক অধিবেশন হয়। ইসহাক গোকুলী, আব্দুল আজিজ, কবি রোস্তম আলী কর্ণপুরী, হজরত আলী প্রমুখ নেতারতৎপরতায় প্রজা আন্দোলন এ জেলায় গণআন্দোলনে পরিণত হয়। জনপ্রিয় প্রজা দরদী নেতা ফজলুলু হকের আবির্ভাবের ফলে এ আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে।

 উৎপন্ন ফসলের তিনভাগের দুই ভাগ স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৪৬-১৯৪৭ সালে অখন্ড বাংলার উনিশটি জেলার মত বগুড়া জেলার আধিয়ার কৃষকরা তেভাগাআন্দোলনে যোগ দেয় ( জুলফিকার হায়দার ২০০৪:পৃ.১৫৮)। তেভাগা সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল সারা ভারত কৃষক সভার নেতৃত্বে । বগুড়া জেলার তেভাগা কর্মকান্ড তুলেধরে এক সরকারী প্রতিবেদনে বালা হয়। ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে এ আন্দোলন  শুরু হয়। মৌলভী আব্দুল কাদের, চৌধুরী মৌলভী নাসির মন্ডল, রামকৃষ্ণ সরকার,মিহির ব্যানার্জী, রসিক চন্দ্র বর্মন এ আন্দোলনে অগ্রভাগে ছিলেন ( সরকারী রিপোর্টে তেভাগা: মার্চ ১৯৪৭, নূহ উল আলম লেনিন ২০০৫: পৃ.১৯২)।

  ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান অর্জনের জন্য মুসলিম লীগ  প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেয়।এতে করে কলকাতায় এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা সংঘঠিত হয়।দাঙ্গার প্রেক্ষিতে ভারত ও আসাম হতে বাস্তুহারা মহাজের লতিফপুর কলোনী, মালতিনগর চকলোকমান কলোনী ও কুঠি বাড়িসহ(দত্ত বাড়ী) বগুড়া জেলার সর্বমোট১৪টি কলোনিতে প্রায় নয় শতাধিক মহাজের অবস্থান নেয় (কাজি মিছের ২০০৭ পৃ.২০২)।

  ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা আইন অনুসারে ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃস্টি হল এ জেলা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তভূর্ক্ত হয়। তখন থেকে শুরু করে বাংলাদেশেরঅভ্যুদয়ের পূর্বকাল পর্যন্ত বগুড়া জেলা পাকিস্তানী শাসনাধীনে ছিল।

 দুটি বিচ্ছিন্ন ভৌগোলিক অংশ নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। যা পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিতি পায়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্টীর পূর্ব পাকিস্তানেরজনসাধারনের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরনের ফলে ক্ষোভ সঞ্চিত হতে থাকে। বিশেষভাবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূথ্বান এবং ১৯৭১সালের অসহযোগ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে বিক্ষোভ সংগ্রামের রুপ নেয় যা ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী সংর্ঘষের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেরঅভ্যূদয় ঘটে।

 ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার মুজিব নগর হতে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করে। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশেফিরে আসেন। তিনি নিজে এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসিবে শপথ গ্রহন করেন। ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন।  মোস্তাকের শাসনামলের(১৫ই আগস্ট-৩রা নভেম্বর১৯৭৫)পর জেনারেল জিয়াউর রহমান (১৯৭৫-১৯৮১খ্রি:) এর শাসনামল শুরু হয়। জিয়াউর রহমান অত্র জেলার গাবতলীর থানার অন্তগর্তবাগবাড়ী গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন।মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। নতুনভাবে বিন্যাসকৃত যুদ্ধকালীন জেড ফোর্সের অধিনায়কও ছিলেন । ১৯৭৮সালে ১লা সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। ১৯৮১ সালের মে মাসে সেনা সদস্যদের হাতে চট্রগ্রামে নিহত হন। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে এরশাদবিচারপতি সাত্তারের নিকট হতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহন করেন। তার শাসনামলে প্রশাসনিক পুনবিন্যাসের আওতায় ১৯৮৪ সালে বগুড়া জেলার একমাত্র মহকুমাজয়পুহাট জেলায় উন্নতি হয়। এতে জেলার ৮টি সংসদীয় আসনের স্থলে ৬টিতে নেমে আসে। এরশাদ ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের সম্মুখীন হন। বগুড়া জেলারছাত্রসমাজ সহ বিরোধীদল ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। গণঅভ্যথ্বানে এরশাদের পদত্যাগের পর অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি এককসংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহর্ধিণী। তার সময়কালেতত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবীতে দুর্বার আন্দোলন সংগঠিত হয়। এজেলাবাসীও এতে সামিল হয়। অতপর: ১৯৯৬ সালে ৩০শে মে মার্চে খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগকরে। ১৯৯৬ সালে জুনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। এবং ২০০১ সালে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। বিপুলসংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা দ্বিতীয় বারের মত ২০০১ সালে সরকার গঠন করে। তার সরকারের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৬ সালে। এরপর ২০০৭ সালথেকে২০০৮ সাল পর্যন্ত তত্ত্ববধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকে। এরপর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মত ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে।

 তথ্যসূত্রঃ

  • আবদুলকরিম, বাংলারইতিহাস(সুলতানিআমল) ঢাকা: জাতীয়গ্রন্থপ্রকাশন,১৯৯৯
  • আবদুলকরিম, বাংলারইতিহাস: মোগলআমল, জাতীয়গ্রন্থপ্রকাশন, ২০০৭
  • আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, বাংলাদেশের প্রত্ন সম্পদ, দ্বিতীয় সংস্করণ, দিব্য প্রকাশ, ২০১১
  • আব্দুররহিমবগরা, বগুড়ানওয়াববাড়ীরইতিহাস,১৯৯৯
  • আব্দুলমমিনচৌধূরী, রাজনৈতিকপটভূমি, আনিসুজ্জামানসম্পাদিতবাংলাসাহিত্যেরইতিহাস, দ্বিতীয়খন্ড, ঢাকা: বাংলাএকাডেমী, ২০০৮
  • এ.কে.এম. শামসুল আলম, মহাস্থান: একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সমীক্ষা, মুহ. মমতাজুর রহমান সম্পাদিত বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, ২০০৯
  • এ.জে.এম.সামছুদ্দীন তরফদার, দুই শতাব্দীর বুকে বগুড়া,প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড, ১৯৭০
  • ওসমানগনিঅনুদিতপল্লীবাংলারইতিহাস, দিব্যপ্রকাশ,২০০২
  • কৃষ্ণধর, ভারতেমুক্তিসংগ্রামেবাংলা,তথ্যওসংস্কৃতিবিভাগ, পশ্চিমবঙ্গসরকার,১৯৯৭
  • গ্রাম বার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা, ১৩-০৯-১৮৭৩
  • জুলফিকারহায়দার, বাংলারসশস্ত্রসংগ্রাম,  ২০০৪
  • ড. এস.এম. রফিকুলইসলাম, প্রাচীনবাংলারসামাজিকইতিহাস: সেনযুগ, বাংলাএকাডেমী, ২০০১
  • ড. বেলাল হোসেন, লোকসাহিত্যের কাঠামোগত স্বাতন্ত্র পূর্ব বগুড়া, বাংলা একাডেমী, ২০০৮
  • ড. মুঈন-উদ-দীনআহম্মদখান, বাংলায়ফরায়েযীআন্দোলনেরইতিহাস, ২০০৭
  • ড. মুহম্মদআব্দুররহিমওঅন্যান্য, বাংলাদেশেরইতিহাস, নওরোজকিতাবিস্তান, দ্বাদশসংস্করন, ২০০৬
  • ড.নুরূল ইসলাম মঞ্জুর, শতবর্ষ পরে ফিরে দেখা ইতিহাস: বঙ্গ ভঙ্গ ও মুসলিম লীগ, ২০১০
  • ড.মুহম্মদইনামউলহক, ভারতেরমুসলমানওস্বাধীনতাআন্দোলন(১৭০৭-১৯৪৭), ১৯৯৩
  • প্রফেসরশাহানারাহোসেন, প্রাচীনবাংলারইতিহাস, ইনস্টিটিউটঅববাংলাদেশস্টাডিজ, রাজশাহীবিশ্ববিদ্যালয়, ২০১২
  • প্রভাসচন্দ্রসেন, বগুড়ারইতিহাস, পুনমুদ্রন, ২০০০
  • বাংলাপিডিয়া, খন্ড-৭, দ্বিতীয়সংস্করণ, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ,২০১১
  • মমতাজুররহমান, হোসেনশাহীআমলেবাংলা (১৪৯৪-১৫৩৮): একটিসামাজিকরাজনৈতিকপর্যষেণা, ঢাকা: বাংলাএকাডেমী, ২০০১
  • মাহবুবুররহমান, বরেন্দ্রভূমিররাজাওজমিদার, মুহ.মমতাজুররহমানসম্পাদিতবরেন্দ্রঅঞ্চলেরইতিহাস,২০০৯
  • মুহম্মদআবুতালিব, ফকীরনেতামজনূশাহ, ইসলামিকফাইন্ডেশন,তৃতীয়সংস্করণ, ২০১২
  •  মো: মাহবুবুর রহমান, বরেন্দ্র ভূমির রাজা ও জমিদার, মুহ. মমতাজুর রহমান সম্পাদিত বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, প্রথম খন্ড, গতিধারা, ২য় সংস্করণ,২০০৯
  • মো: মোশারফহোসেন, ইতিহাসেরআলোকে: আদিঐতিহাসিকবাংলাদেশ, বিজয়প্রকাশ, ২০০৭
  • মো: রফিকুল ইসলাম,তুরষ্কের খিলাফত বিপর্যয়ে ভারত তথা বাংলার মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া, ২০১০
  • মো: সাজ্জাদুররহমান, বগুড়াশহেররইতিহাসওঐতিহ্য,১৮২১-২০০৬, পিএইচ.ডিথিসিস ( অপ্রকাশিত) রাজশাহীবিশ্ববিদ্যালয়, ১০১৩
  • রজতকান্তরায়, পলাশীরষড়যন্ত্রওসেকালেরসমাজ, কলকাতা, ২০০৫
  • রতনলালচক্রবর্তী, সিপাহীবিদ্রোহ, সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭০৪-১৯৭১)১৯৯৩
  • রতন লাল চক্রবর্তী, সিপাহী যুদ্ধ ও বাংলাদেশ, ১৯৮৪
  • রমেশচন্দ্রমজুমদার, বাংলাদেশেরইতিহাস, দ্বিতীয়খন্ড, (মধ্যযুগ)পঞ্চমসংস্করণ,কলিকাতা: জেনারেলপ্রিন্টার্সএ্যান্ডপাব্লিশার্সপ্রাইভেটলিমিটেড,১৯৯৮
  • রমেশ চন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ, দশম সংস্করণ, জেনারেল প্রিন্টার্স এ্যান্ড পাব্লিশার্স লিমিটেড,
  • রমেশচন্দ্র মজুমদার,বাংলাদেশের ইতিহাস, তৃতীয় খন্ড, আধুনিক যুগ, কলকাতা, ১৯৭১
  • রাখালদাসবন্দোপাধ্যায়, বাঙলারইতিহাস, অখন্ডসংস্করণ, দেজপাবলিশিং ,২০০৮
  • শ্রীকালীকমলসার্বভৌমরচিতড.রতনলালচক্রবর্তীসম্পাদিত সেতিহাস বগুড়ার বৃত্তান্ত, ২০১১
  • সরকারী রিপোর্টে তেভাগা: মার্চ ১৯৪৭, নূহ উল আলম লেনিন, তেভাগার কথা ও বাংলার কৃষক আন্দোলন, ২০০৫
  • সুখময়মুখোপাধ্যায়, বাংলারইতিহাস (১২০৪-১৫৭৬খ্রি), ঢাকা: খানব্রার্দাসএ্যান্ডকোম্পানী ,২০০০
  • সুধীররন্জনদাশ, কর্ণসুবর্ণ-মহানগরী, বঙ্গদেশেরবিস্মূতনগরী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যপুস্তক পর্ষৎ,কলকাতা, ১৯৯২
  • সুনীতি ভূষণ কানুনগো, বাংলার শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস, চট্রগ্রাম, ১৯৯০
  • সুপ্তিকণা মজুমদার, বাংলাদেশের প্রাচীন সমাজ, বাংলা একাডেমী, ২০১০
  • সুপ্রকাশরায়,ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, কলকাতা, র্যাডিক্যাল, ২০১২
  • সৈয়দ মোশারফ হোসেন, দিনাজপুরের ইতিহাস, প্রাগৈতিহাসিক ও ঐতিহাসিকযুগ, নওরোজ সাহিত্য মজলিশ, দিনাজপুর,১৯৬৫

Visitor Counter

4335

Recent News
Invitation Card
Recent Activities of GBUS
সাম্প্রতিক কার্যক্রম
সাফল্যের গল্পঃ পারিবারিক নির্যাতন এর উপরে মীমাংশা
সংস্থার বিভিন্ন কার্যক্রম
Recent Activities Of USA
Important Notice for all NGOs
ধুনটে প্রতিবন্ধি দিবস পালিত
Providing necessary photos and information
Eid-Ul-Azha
Important Notice for All NGO
Implementing Activities under Bogra District
Recent Activity
ভার্মিকম্পোস্ট/কেঁচো সার উৎপাদন প্রকল্প উদ্বোধন
ASA launches Power Tiller Loan
Water and Sanitation Program
৩৫ তম বার্ষিক সাধারন সভা ,২০১৪
Physiotherapy Program
Health Awareness Program
Primary Education Strengthening Program
Recent Activities
Porisker's Determination to a Vision
Recent Activities Of Alore Dishari
স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে উপজেলা এ্যাডভোকেসি সভা
স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে উপজেলা এ্যাডভোকেসি ওয়ার্কশপ
IMPLEMENTATION STRATEGY
Future Plan of the Organization
Recent Activities
Recent Activities Of RPF
বগুড়া জেলার সংস্থার বিভিন্ন কর্মসূচী/কার্যক্রম বাস্তবায়ন সংক্রান্ত তথ্য
Recent Activities of KMSS
এক নজরে চলমান কর্মসূচী
AZEECON ToT on Community-managed Climate Change Actions concludes
14th RDRS Partners’ Consultation concludes
Assistance provided to the flood-affected people
CARE BANGLADESH CURRENT PROJECT INFORMATION
All Project Pocation Map of CARE BANGLADESH
Recent Activities of SANCO
সাফল্যের গল্প (পসাউস)
চলমান কার্যক্রম সমূহ
Recent Activities of UDPS
Recent Activities of Chalanbil Socity
Net working/Form Meeting Information (2011-2014)
Information of Training from Outside (Period: 2012-2013-2014)
Information About all Meetings/Seminar/Workshop (Poriod: 2011-2012, 2012-2013 and 2013-2014)
Recent Activities
Recent Activities of GBS
Kamalpur, Dhunot and Shariakhandi Flood Relief and Rehabilitation Report
Woman Story
Child Story
Story of a Disable Person
Relief Distribution Work Details
সাফল্যের গল্প ( সংগ্রামী ফাতেমার জীবন গাথাঁ )
সাফল্যের গল্পঃ ১
সাফল্যের গল্পঃ ২
সাফল্যের গল্পঃ ৩
সাফল্যের গল্প
Success Story
'রায়নগর সামাজকি সুরক্ষা দলরে' সৌজন্য শেষে পর্যন্ত আট মাসরে শশিুকে ফিরে পেল মা
‘‘এ যাত্রায় একটি নতুন পথের সন্ধান পেল ওরা ১৪ জন..... ”
Protecting Human Rights (PHR) Program
Recent Activities at Bogra


List Of All NGOs
AAA AAA
Alore Dishari Mohila Unnaon Shongstha Alore Dishari Mohila Unnaon Shongstha
ASA ASA
Association for Community Development (ACD) Association for Community Development (ACD)
BADAS-Perinatal Care Project BADAS-Perinatal Care Project
Bangladesh Association for Maternal And Neo-Natal Health(BAMANEH) Bangladesh Association for Maternal And Neo-Natal Health(BAMANEH)
Bangladesh Extension Education Services(BEES) Bangladesh Extension Education Services(BEES)
Bangladesh National Woman Lawyers' Association(BNWLA) Bangladesh National Woman Lawyers' Association(BNWLA)
Bogra Young Men's Christian Association Bogra Young Men's Christian Association
BRAC - ব্র্যাক BRAC - ব্র্যাক
BURO Bangladesh BURO Bangladesh
CARE BANGLADESH CARE BANGLADESH
ccc ccc
Family Planning Association of Bangladesh (FPAB) Family Planning Association of Bangladesh (FPAB)
FH  ASSOCIATION FH ASSOCIATION
Focus Society Focus Society
Gram Bangla Unnayan Sangstha (GBUS) Gram Bangla Unnayan Sangstha (GBUS)
Gram Bikash Sangstha (GBS) Gram Bikash Sangstha (GBS)
GRAM UNNAYAN DHARA – GUD GRAM UNNAYAN DHARA – GUD
Gram Unnayan Karma (GUK) Gram Unnayan Karma (GUK)
Grameen Alo Grameen Alo
Grameen Bikash Foundation (GBF) Grameen Bikash Foundation (GBF)
KMSS ( Khulna Mukti Seba Sangstha ) KMSS ( Khulna Mukti Seba Sangstha )
Lepra Bangladesh Lepra Bangladesh
Manabik Sahajay Sangstha (MSS) Manabik Sahajay Sangstha (MSS)
Marie Stopes Marie Stopes
mmm mmm
Mohishbathan Samaj Kallayan Samiti (MSKS) Mohishbathan Samaj Kallayan Samiti (MSKS)
Mothurapara Mohila Unnyan Sangstha (MMUS) Mothurapara Mohila Unnyan Sangstha (MMUS)
NGO Forum for Public Health NGO Forum for Public Health
Pally Samazic Unnayan Sanggathan (PSAUS) Pally Samazic Unnayan Sanggathan (PSAUS)
Plan International Bangladesh Plan International Bangladesh
Polly Gono Unnayan Sangstha (PGUS)
Prodip Sangstha (PS) Prodip Sangstha (PS)
RDRS Bangladesh RDRS Bangladesh
RHSTEP RHSTEP
SANCO- Social Advancement Networking Community Organization SANCO- Social Advancement Networking Community Organization
Shuranjana Social Service Association (SSSA) Shuranjana Social Service Association (SSSA)
Social Economic Development Society (SEDS) Social Economic Development Society (SEDS)
Society for Own Village Advancement (SOVA), Society for Own Village Advancement (SOVA),
SOS Children’s Village Bogra SOS Children’s Village Bogra
STR Foundation STR Foundation
The Glencoe Foundation The Glencoe Foundation
Transparency International Bangladesh (TIB) Transparency International Bangladesh (TIB)
Village Education Resource Center (VERC) Village Education Resource Center (VERC)
অবলম্বন নারী সংঘ (অনাস)
আব্দুল হাই জহুরা ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন আব্দুল হাই জহুরা ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন
আমেনা ফাউন্ডেশন আমেনা ফাউন্ডেশন
আলোর পথে
ইউনিয়ন ফর সোস্যাল এ্যাডভান্সমেন্ট (ঊষা)। ইউনিয়ন ফর সোস্যাল এ্যাডভান্সমেন্ট (ঊষা)।
উত্তরা ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম সোসাইটি (ইউডিপিএস) উত্তরা ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম সোসাইটি (ইউডিপিএস)
এসো গড়ি
ওরাপ ওরাপ
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ
করতোয়া পল্লী উন্নয়ন সংস্থা করতোয়া পল্লী উন্নয়ন সংস্থা
খন্দকার কল্যাণ ট্রাস্ট এন্ড অর্গানাইজেশন (KKTO) খন্দকার কল্যাণ ট্রাস্ট এন্ড অর্গানাইজেশন (KKTO)
গণপ্রচেষ্ঠা সংস্থা
গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প ( GUP)
চলনবিল হেলথ এন্ড এনভারমেন্ট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি চলনবিল হেলথ এন্ড এনভারমেন্ট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি
চার্চ্চেস অব গড মিশন চার্চ্চেস অব গড মিশন
ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (TMSS) ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (TMSS)
তারা পলিস্ন উন্নয়ন সংস্থা
ধ্রুব সোসাইটি
নবজাগরন সংস্থা (NJS) নবজাগরন সংস্থা (NJS)
নামুজা অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংস্থা (NEDO) নামুজা অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংস্থা (NEDO)
পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প
পল্লী স্বাস্থ্য উন্নয়ন সংস্থা পল্লী স্বাস্থ্য উন্নয়ন সংস্থা
পেস্ড পেস্ড
বসতি ফাউন্ডেশন
মৈত্রী পল্লী উন্নয়ন সংগঠন (MPUS) মৈত্রী পল্লী উন্নয়ন সংগঠন (MPUS)
রহবল প্রগতি ফাউন্ডেশন (RPF) রহবল প্রগতি ফাউন্ডেশন (RPF)
লাইট হাউস লাইট হাউস
ল্যান্ডলেস ডিসট্রেসড রিহ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন আলম মঞ্জিল
সিমবায়োসিস বাংলাদেশ সিমবায়োসিস বাংলাদেশ
সোশ্যাল এডভান্সমেন্ট প্রোগ্রাম এন্ড নেটওয়ার্কিং অর্গানাইজেশন সোশ্যাল এডভান্সমেন্ট প্রোগ্রাম এন্ড নেটওয়ার্কিং অর্গানাইজেশন
হিউম্যান এসোসিয়েশন ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (HARD) হিউম্যান এসোসিয়েশন ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (HARD)
হিউম্যান রির্সোসেস ডেভেল্পম্যান্ট প্রজেক্ট
হেলথওয়েজ ফাউন্ডেশন